ইসলামে ঐক্যবদ্ধতার গুরুত্ব ও আমাদের অবস্থা

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য যিনি আমাদের মুসলমানের ঘরে জন্ম দিয়ে তার সত্য ধর্ম ইসলামকে পালন করা সহজ করে দিয়েছেন। শত কোটি দরুদ ও সালাম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যিনি সারাটি জীবন বিশ্বের সমগ্র মানুষকে একটি ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম তথা ইসলামের দিকে আহ্বান করে আজ মদীনার বুকে শুয়ে রয়েছেন।
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সামাজিক জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। এজন্য মানুষ কখনও একা একা থাকতে কিংবা চলা-ফেরা করতে পারে না। জৈবিক মানবিক সকল দিক থেকেই মানুষ একে অপরের প্রতি বিশেষভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু কেন আল্লাহ তায়ালা আমাদের এমন করে সৃষ্টি করলেন? অন্যান্য সাধারণ প্রাণীদের মতো একাকী স্বাধীন মন-মানসিকতা দিয়ে তিনি আমাদের সৃষ্টি করলেন না কেন?
¯্রষ্টার সৃষ্টির মধ্যে বিদ্যমান অপার রহস্য ভেদ করা বড়ই কঠিন কাজ। তবে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে মনে হয়, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে মানুষের মধ্যে এই বিশেষ গুণ দেওয়ার কারণ হলো, তার বান্দারা যেন ইবাদতের উদ্দেশ্যে নিজেদের মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান সৃষ্টি করতে পারে। তারা যেন ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর যমিনে তার দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
মানুষের সেই সত্তাগত গুণকে স্মরণ করে দিতেই আল্লাহ তায়ালা তার পবিত্র কুরআনে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ্য করে ইরশাদ করেন,
‘আর তিনি মুমিনদের অন্তরে প্রীতি ও ঐক্য স্থাপন করেছেন।’ (সুরা আনফাল : ৬৩)
এরপর আল্লাহ তায়ালা ঐক্যের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বোঝাতে গিয়ে বলেন,
‘তুমি যদি পৃথিবীর সমুদয় সম্পত্তিও ব্যয় করতে তবুও তাদের অন্তরে প্রীতি, সদ্ভাব ও ঐক্য স্থাপন করতে পারতে না। (সুরা আনফাল : ৬৩)
মুসলমানদের পরস্পর সম্প্রীতি ও ঐক্যবদ্ধতাকে আল্লাহ তায়ালা বিশেষ নেয়ামত বলে আখ্যায়িত করে বলেন,
‘আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তায়ালা তোমাদের দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, এরপর আল্লাহ তায়ালা তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে এখন তোমরা তার অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছো। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৩)
লক্ষ্য করুন, ইসলাম যখন তাদেরকে একত্র করলো তখন আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহে তারা ভাইভাই হয়ে গেল। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা সাহাবীদের ঐক্য-সম্প্রীতি কামনা করতেন। তিনি সমগ্র মুসলমানদের একটি দেহের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, ‘সমস্ত মুসলমান একটি দেহের ন্যায়। যদি তার চোখ ব্যথা হয় তাহলে তার সমগ্র শরীর সে ব্যাথা অনুভব করে। আর যদি তার মাথা ব্যথা করে তখনও সমগ্র শরীর সে ব্যথায় কাতর হয়ে পড়ে।
সাহাবায়ে কেরামদের মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন এতটাই অটুট ছিল যে, সে সময় পুরা মুসলিম বিশ্ব একটি দেহের ন্যায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। দেহের এক অঙ্গ ব্যথা পেলে যেমন অন্যান্য অঙ্গ তার ডাকে সাড়া দেয়। তেমনি একজন মুসলিমের কষ্টে তখন পুরা মুসলিম বিশ্ব ব্যথায় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়তো এবং তার সাহায্যে সর্বশক্তি ব্যয় করতো।
আজ আমাদের বাস্তবতা বড়ই নির্মম। অত্যন্ত কঠিন এক সময় অতিবাহিত করছি আমরা। আমরা আজ একই ধর্মের অনুসারী হয়েও বিভিন্ন দলে, মতে আর বিশ্বাসে বিভক্ত। বিভেদের ছোট ছোট প্রাচীর আমাদের সামনে এতটাই বড় আর নির্মম হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, আমরা অন্ধের মতো সেই বিভেদকেই বড় করে দেখছি। ব্যক্তি, দল আর মতের স্বার্থে আমরা একে অপরকে কাফের বলতেও সামান্যতম দ্বিধা করছি না। অথচ আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট নির্দেশ ছিল আমাদের প্রতি,
‘আর তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ করো। পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। (সুরা আলে ইমরান : ১০৩)
বিশুদ্ধ তাফসির গ্রন্থ তাফসিরে ইবনে কাসিরে উল্লেখ করা হয়েছে, এখানে আল্লাহর রজ্জু বলতে ‘পবিত্র কুরআন’কে বুঝানো হয়েছে। আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আল্লাহর রজ্জু দ্বারা এখানে দ্বীন ইসলামকে বুঝানো হয়েছে। তবে প্রতিটি মতের সারমর্ম এই দাঁড়ায় যে, ইসলাম আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের একতাবদ্ধভাবে অবস্থান করার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। আর এই একতাবদ্ধতার কেন্দ্র ও মূল হবে পবিত্র কুরআন, দ্বীনে ইসলাম। কারণ পবিত্র কুরআন যে শুধুমাত্র একতা, শৃঙ্খলা মৈত্রী এবং দলবদ্ধভাবে থাকার শিক্ষাই দেয় না বরং তা অর্জন করতে হয় কীভাবে, তার ওপর অটল অবিচল থাকতে হয় কিভাবে তারও পদ্ধতি বাতলে দিয়েছে।
ইসলামের প্রায় প্রতিটি ইবাদত ও তার পদ্ধতিগত বিষয়গুলোর প্রতি গভীরভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, আল্লাহ তায়ালা এবং তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সব ইবাদতের মাধ্যমে বিশেষত মুসলমানদের অন্তরে পরস্পরে ঐক্য সৃষ্টির ব্যপারে সক্রীয় ভূমিকা রেখেছেন। যেমন নামাযের জন্য জামায়াতের ব্যবস্থাপনা, হজ্বের জমায়েত, আরাফার ময়দানে অবস্থান, জুময়ার প্রবর্তন ইত্যাদি আহকামে শরিয়ার মাধ্যমে আমরা মুসলমানগণ পরস্পরে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে চলে আসতে শিখি।
মুসলমানদের এই বিশাল গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করেছে ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুরা। তারা তাদের পারস্পরিক মতবিরোধ মিটিয়ে সবাই একই জাতিতে পরিণত হয়েছে। তারা তাদের মতভেদ ভুলে গিয়েছে। খ্রিষ্টান বিশ্বের প্রতি লক্ষ্য করলেই বিষয়টি আপনাদের সম্মুখে পরিস্কার হয়ে যাবে। তারা একসময় ক্যাথলিক, প্রোস্ট্রেট ইত্যাদি নানা জাতীয় বিশ্বাসে বিভক্ত ছিল। আজ তারা তাদের মধ্যে থেকে সর্ব রকমের বিভেদ প্রাচীর তুলে দিয়েছে। তারা আজ আটাশটি দেশ একই রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন’ নামে পরিচিত। একটি ভিসা দিয়ে এইসব দেশে যাওয়া যায়। ঐক্যের একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত তারা কায়েম করে ফেলেছে।
কিন্তু আমরা! আমাদের এই ইসলামপ্রিয়, ধর্মভীরু মুসলিম দেশ বাংলাদেশের কথাই বলি না কেন, এখানে কি আমরা কখন কোনো বিষয়ে একটি ঐক্যমত সৃষ্টি করতে পেরেছি? আমাদের মাঝে সামান্য থেকে সামান্য বিষয়ে, স্বার্থের ব্যঘাত ঘটলেই সৃষ্টি হয় নতুন আরেকটি দলের। আমরা পরস্পরে মারামারি, হানাহানি আর কাদা ছুড়াছুড়িতে সিদ্ধহস্ত। আমাদের বৃহৎ শক্তি আজ খ–বিখ- হতে হতে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যে, নাস্তিক মুর্তাদরা আমাদের এহেন পরিস্থিতি দেখে শয়তানের হাসি হাসে। আমরা তাদের হাসি-তামাশা আর তাচ্ছিল্যের খোরাকে পরিণত হয়েছি।
এখন প্রশ্ন হলো, কিভাবে আমরা পারস্পরিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করে একটি ঐক্যবদ্ধ ভিত্তি নিয়ে সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারি।
সম্পীতি প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলাম অনেক উৎসাহ দিয়েছে। আমাদের ধর্মে এমন অনেক রীতিনীতি আছে যা সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে। যেমন সালাম প্রচার, রোগীর সেবা, হাদিয়া প্রদান ও মুচকি হাসা ইত্যাদি। আপনি যদি চিন্তা করেন তাহলে দেখবেন এগুলো সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে।
আল্লাহ তায়ালা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন অনেক কাজ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন, যা সম্প্রীতি নষ্ট করে, ঐক্যবদ্ধতা ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়। ফাসাদ, ঝগড়া সৃষ্টি করে বলে তা হারাম করা হয়েছে। যেমন গীবত, চোগলখোরি, মিথ্যা, মানুষকে অবজ্ঞা, চুরি, হত্যা ইত্যাদি। এগুলো সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের মুখের হেফাজত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন,
সে যা কথাই বলেনা কেন তার সামনে একজন ফেরেশতা উপস্থিত আছে (যিনি সবকিছু লিখে রাখেন) (সুরা কফ : ১৮)
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে সম্প্রীতির সঙ্গে চলার এবং সর্ব প্রকারের বিভেদসৃষ্টিকারী কর্ম থেকে দূরে থাকার তাওফিক দান করুন (আমিন)

1 thought on “ইসলামে ঐক্যবদ্ধতার গুরুত্ব ও আমাদের অবস্থা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

slieder

Featured Posts
May 2018
M T W T F S S
    Jun »
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  
সর্বসত্ত্ব সত্বাধীকারী- শায়খ আফতাব উদ্দিন ফারুক Ⓒ