দাওয়াহ : পথ ও পদ্ধতি

লেখকের আরজ
الحمد للہ رب العالمین والعاقبۃ للمتقین،
والصلوۃ والسلام علی رسولہ الکریم، امابعد
মহান আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে অসংখ্য নবি ও রাসুল প্রেরণ করেছেন মানুষকে সত্য ও সুন্দরের প্রতি আহ্বান করার জন্য। আর এ-জন্য নবি রাসুলদের মূল দায়িত্ব ছিল, মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা, তাদেরকে সৎকাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ۞
অর্থ : বলুন এটাই আমার পথ। আমি জেনে বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও। আর আল্লাহ পবিত্র মহান এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। [সুরা ইউসুফ, আয়াত ১০৮]
তাই একজন মুসলমানের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান কাজ হলো ‘দাওয়াহ ইলাল্লাহ’ তথা মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلٰى اللهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِيْ مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ۞
অর্থ : সেই ব্যক্তির চেয়ে আর কার কথা উত্তম হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয় এবং সৎকাজ করে। আর বলে, আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত। [সুরা হামিম সাজদাহ, আয়াত ৩৩]
فَوَاللَّهِ لأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِكَ رَجُلاً وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْرُ النَّعَمِ.
‘আল্লাহর শপথ, ‘তোমার মাধ্যমে একজনকে আল্লাহর হেদায়েত দান করা তোমার জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম।’ [বুখারী : ৪২১০; মুসলিম : ৬৩৭৬]
জাতিগতভাবে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে একে অপরের শুভাকাঙক্ষী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ইবাদত ও আমলের পাশাপাশি কুরআন ও সুন্নাহের ভিত্তিতে মুসলমানদের অন্যতম করণীয় হিসেবে সর্ববৃহৎ দায়িত্ব হচ্ছে দাওয়াত ও তাবলিগ। যুগে যুগে উম্মতে মুহাম্মাদি এই দাওয়াতি কাজ আঞ্জাম দিয়ে আসছে।
কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এই মহান কাজের প্রতি আমাদের ক্রমেয় অনিহা এবং অনাগ্রহ আমাদের দীন ও ইমানের অবস্থাকে একেবারে কলুষিত করেছে। আস্তে আস্তে আমরা এই কাজের জন্য উপযুক্ত মানুষ ও যোগ্য ব্যক্তিত্ব হারিয়ে বসছি। খাইরুল কুরুনের সেই যুগান্তকারী দাওয়াহ-পদ্ধতি ও গভীরতম ইখলাস আজ আমাদের থেকে বিদায় নিয়েছে। যার কারণে আমাদের মুসলিম সমাজে দা‘ইগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও হেদায়েতপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমেয় হ্রাস পাচ্ছে। এই বিষয়গুলো সামনে রেখে আমি চেষ্টা করি ইসলামি দাওয়াহ সম্পর্কে একটি পুস্তক রচনা করার। আলহামদুলিল্লাহ, ছুম্মা আলহামদুলিল্লাহ, বইটির কাজ ইতোমধ্যে পূর্ণতায় চলে এসেছে।
বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতার যুগ। বিশেষ করে ইন্টারনেট ও মিডিয়ার মাধ্যমে আমাদের দাওয়াতি কাজকে আরও বেগবান করতে হবে। কারণ সারা বিশে^র মানুষ এখন কোনো কিছু জানার জন্য অনেকটা ইন্টারনেট নির্ভর হয়েছে। তাই তাদের দিকে লক্ষ্য করে দাওয়াত ও তাবলিগের চিরাচরিত পদ্ধতি বর্ণনার পরে বইটিতে দাওয়াতের পথ ও পদ্ধতি এবং মাধ্যম সম্পর্কে সমসাময়িক বিষয়ের ওপর দুটি প্রবন্ধ সংযোগ করেছি। দাওয়াহ যেহেতু একটি সার্বজনীন বিষয় তাই বিষয়টি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। আশা করি পাঠক সমাজ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন।
বইটি সংকলন করার সময় আমি এর প্রতিটি রেফারেন্স ও উদ্ধৃতি কুরআনের আয়াত ও রাসুলুল্লাহ #-এর পক্ষ থেকে সহিহ সনদে বর্ণিত হাদিসকে উল্লেখ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারপরেও মানুষ হিসেবে ভাষাগত ও বিষয়গত ত্রুটি থাকতে পারে। সে জন্য বিজ্ঞ পাঠকের ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি কামনা করছি। এ ব্যাপারে আপনাদের সুচিন্তিত মতামত ও উপকারী পরামর্শ সাদরে গ্রহণ করা হবে এবং পরবর্তী সংস্করণে তা সংশোধন করা হবে ইনশাআল্লাহ।
সবশেষে পুস্তিকাটির সূচনাকাল থেকে শুরু করে পাঠকের হাতে পৌঁছা পর্যন্ত যাদের পরিশ্রম ও আন্তরিকতার স্বাক্ষর লেগে আছে তাদের সবার জন্য হৃদয়ের গভীর থেকে দোয়া রইলো। আল্লাহ তায়ালা যেন এর লেখক, পাঠক, প্রকাশক ও সহযোগী সবাইকে উভয়জগতের সফলতা দান করেন। (আমিন)
ইতি
শাইখ আফতাব উদ্দিন ফারুক

সূচিপত্র
বিষয় পৃষ্ঠা
দাওয়াহ
দা‘ই : ( (الداعی ১৩
মাদ‘উ : (مدعو) ১৩
ইলমুদ-দাওয়াহ : (علم الدعوہ) ১৪
ইলমুদ-দাওয়াহ’র সূচনালগ্ন ১৪
দাওয়াহ’র শর‘য়ি অবস্থান ১৬
কুরআনের আলোকে প্রথম দলের প্রমাণপঞ্জি ১৭
হাদিসের আলোকে প্রথম দলের প্রমাণপঞ্জি ১৮
কুরআনের আলোকে দ্বিতীয় দলের দলিল ১৮
যে মতটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য ১৯
অপরাপর প্রমাণসমূহের জবাব ২০
দাওয়াহ’র গুরুত্ব ২৩
দাওয়াহ’র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ২৬
দাওয়াহ’র মূলনীতি
দাওয়াহ’র উৎস ২৭
দাওয়াহ’র রুকন ২৮
দা‘ইর পরিচয় ২৯
দা‘ইর গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য ২৯
দা‘ইর গুণাবলী ৩১
মাদ‘উর পরিচয় ৪০
মাদ‘উর স্তরসমূহ ৪০
মাদ‘উর হক ৪২
এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সা.-এর অবস্থান ৪২
মাদ‘উর দায়িত্ব ৪৪
মাদ‘উর প্রকারভেদ ৪৪
মাদউর প্রথম বিভাগের প্রকারভেদ ৪৪
মাদ‘উর দ্বিতীয় বিভাগের প্রকারভেদ ৪৬
দাওয়াহ’র বিষয়বস্তু ৪৭
বিষয় পৃষ্ঠা
দাওয়াহ’র পদ্ধতি
দাওয়াহ’র পদ্ধতির প্রকারভেদ ৪৮
প্রথম পদ্ধতি : হিকমত ৪৯
হিকমত প্রকাশের ক্ষেত্রসমূহ ৪৯
নাহি আনিল মুনকারের ক্ষেত্রে সাবধানতা ৫১
দ্বিতীয় পদ্ধতি : সদুপদেশ ৫৪
দৃশ্যপট ৫৪
তৃতীয় পদ্ধতি : উত্তম পন্থায় বিতক ৫৬
বিতর্কের সংজ্ঞা ৫৬
বিতর্কের প্রকারভেদ ৫৬
কখন বিতর্কে যাবে? ৫৬
বিতর্কের আদব ৫৭
বিতর্ক পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য ৫৮
চতুর্থ পদ্ধতি ৬১
উত্তম আদর্শ ৬১
উত্তম আদর্শের সংজ্ঞা ৬১
উত্তম আদর্শের প্রকারভেদ ৬২
উত্তম আদর্শের গুরুত্ব ৬২
উত্তম আদর্শের বৈশিষ্ট্য ৬৩
প্রথম প্রবন্ধ ৬৫
দাওয়াতের সমসাময়িক পথ ও পদ্ধতি ৬৫
ইন্টারনেটে দাওয়াহ প্রেক্ষাপট ও প্রয়োজনীয়তা ৬৯
দ্বিতীয় প্রবন্ধ ৭২
ইন্টারনেটে দাওয়াতি প্রক্রিয়া ৭২
আল্লাহর পথে ডাকার জন্য একটি ওয়েব সাইট তৈরি করুন ৭২
অনলাইন চ্যাটের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকা ৭৩
আল্লাহর দিকে মানুষকে ডাকার জন্য ই-মেইল ব্যবহার করা ৭৬
ভবিষ্যতে ইসলামের ওপর ভ্রান্ত ফেরকাগুলোর সাইটের প্রভাব ৭৮
যুব সম্প্রদায়ের প্রতি বিনীত আবেদন ৭৮

দাওয়াহ : (الدعوۃ)
আভিধানিক অর্থ : দাওয়াহ (الدعوۃ) শব্দটি দা‘উন (دعو) মূল ধাতু থেকে উদ্ভাবিত, অর্থ ডাকা, আহ্বান করা, প্রচার করা, পৌঁছে দেওয়া, পরিতুষ্ট করা, দাবি করা ইত্যাদি।
পারিভাষিক অর্থ : দাওয়াহ হচ্ছে ইসলামের সুমহান বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, তাদেরকে ইসলামের শিক্ষা প্রদান করা এবং বাস্তবজীবনে এর প্রতিফলন ঘটানো।
দা‘ই : ( (الداعی
আভিধানিক অর্থ : দা‘ই (الداعی) আহ্বানকারী, প্রচারকারী, দাবি উত্থাপনকারী।
পারিভাষিক অর্থ : দা‘ই (الداعی) সেই ব্যক্তিকে বলা হয়, যিনি নির্দিষ্ট কোনো মতবাদ বা ধর্মবিশ^াসের দিকে মানুষকে আহ্বান করেন।
দা‘ই হিসেবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন ইসলামের প্রথম ও প্রধান ব্যক্তিত্ব। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يَا قَوْمَنَا أَجِيْبُوْا دَاعِيَ اللهِ وَ اٰمِنُوْا بِه يَغْفِرْ لَكُمْ مِنْ ذُنُوْبِكُمْ وَيُجِرْكُمْ مِنْ عَذَابٍ أَلِيْمٍ۞
হে আমার কওমের লোকেরা! তোমরা আল্লাহর দা‘ইর ডাকের সাড়া দাও। তার প্রতি ইমান আনায়ন কর। তিনি (আল্লাহ) তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন এবং তোমাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে মুক্তি দান করবেন। [সুরা আহক্বাফ, আয়াত ৩১]
মাদ‘উ : (مدعو)
আভিধানিক অর্থ : মাদ‘উ (مدعو), আহুত (যাকে ডাকা হয়েছে)
পারিভাষিক অর্থ : মাদ‘উ (مدعو) সেই ব্যক্তিকে বলা হয়, দা‘ই (الداعی) যার কাছে দাওয়াহ (الدعوۃ) পেশ করেন।
ইলমুদ-দাওয়াহ : (علم الدعوہ)
আভিধানিক অর্থ : ইলমুদ-দাওয়াহ : (علم الدعوہ) দাওয়াহ ভিত্তিক শাস্ত্র, আহ্বান বিষয়ক শাস্ত্র।
পারিভাষিক অর্থে : ইসলামি শরিয়ায় ইলমুদ-দাওয়াহ (علم الدعوہ) এমন একটি শাস্ত্রের নাম যাতে দাওয়াহ’র ইতিহাস ও মূলনীতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা এবং তৎসঙ্গে দাওয়াহ‘র পদ্ধতি, নিয়ম-নীতি, উপকরণ ও উৎস সম্পর্কে সাম্যক ধারণা প্রদান করা হয়।
ইলমুদ-দাওয়াহ’র সূচনালগ্ন
যখন থেকে ইসলামি জ্ঞানচর্চা ও তার আমল আরম্ভ হয় তখন থেকেই ইসলামি দাওয়াহ’র সূচনা হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের মধ্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে দা‘ই হিসেবে আবির্ভূত হয়ে তাদের সম্মুখে আল্লাহর আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করে শোনান, তাদেরকে কিতাব তথা কুরআনের বাণী শিক্ষা দেন এবং হিকমাহ (সুন্নাত)-এর অনুশীলন করেন। আল্লাহ তায়ালা বিষয়টি এভাবে ব্যক্ত করেছেন,
هُوَ الَّذِيْ بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّيْنَ رَسُوْلًا مِنْهُمْ يَتْلُوْ عَلَيْهِمْ اٰيَاتِه وَيُزَكِّيْهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوْا مِنْ قَبْلُ لَفِيْ ضَلَالٍ مُّبِيْنٍ۞
অর্থাৎ তিনিই নিরক্ষরদের মধ্যে একজন রাসুল প্রেরণ করেছেন। যিনি তাদেরকে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে শোনান, তাদের অন্তরকে পবিত্র করেন এবং কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দান করেন। যদিও তারা ইতোপূর্বে সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে নিপতিত ছিল। [সুরা জুমআ, আয়াত ২]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরাম রিদওয়ানুল্লাহি আলাইহিম আজমায়িন তার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরে তারা এই আমানতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ইসলামের মহান বাণী প্রচার ও প্রসারে তৎপর থাকেন।
সাহাবায়ে কেরামের পর এলেন সত্যানুসারী তাবেয়িগণ। তারাও সুচারুরূপে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। এরপর পরবর্তী প্রজন্ম একের পর এক ধারাবাহিকভাবে এই মহান দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে থাকেন। এভাবেই তারা ইসলামের প্রচার ও প্রসারে অসামান্য অবদান ও নিরন্তর পরিশ্রমের স্বর্ণময় স্বাক্ষরতা স্থাপন করেন এই পৃথিবীর বুকে। ইতিহাসের স্বর্ণময় পত্রে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর তারাই ছিলেন দীনি দাওয়াহ’র একনিষ্ঠ আহ্বায়ক।
সময় থেমে থাকেনি। কালের পরিক্রমায়, অব্যার্থ নিয়মের শাসন মেনে পূর্ববর্তীরা চলে গেলেন পৃথিবীর মায়া ছেড়ে। সেই সঙ্গে বিদায় হলো মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ ইমানি বৈশিষ্ট ও দাওয়াহ’র দায়িত্ববোধ। ফলে এই মূল্যবান পথ থেকে ক্রমেয় দূরে সরে পড়লো পরবর্তী মুসলমানদের অনেকেই। তাদের মধ্যে একদল লোক বের হলো, যারা ইলম থেকে আমলকে পৃথক করে ফেলল। তারা শুধু ইলম নিয়েই ব্যস্ত থাকতো, আমলের ধার ধারতো না। পক্ষান্তরে আরেক দল লোক বের হলো, যারা ইলম ছাড়াই আমল করতে শুরু করলো। তারা না জেনে, না শুনে বিভ্রান্তভাবে আমলের রাস্তা ইখতিয়ার করলো। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রেখে যাওয়া দাওয়াহ পদ্ধতি। এতে সাধারণ মানুষের নিকট দাওয়াহ’র তৎপরতা, মৌলিকত্ব এবং সজিবতা ক্রমেয় হারিয়ে যেতে থাকে। বিশেষত ইসলামি খেলাফত বিলুপ্ত হওয়ার পর এই ব্যাধিটি আরও প্রকট আকার ধারণ করলো।
এরপর কিছু মুসলমানের অন্তরে আল্লাহ তায়ালা দীনের সহিহ বুঝ দান করলেন। তারা এ বিষয়ে অনেকটা সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেন। মুসলমানদের দিকে ধেয়ে আসা বিপদের ভয়াল আগ্রাসন আঁচ করতে সক্ষম হন। ফলে এককভাবে এবং সম্মিলিতভাবে দাওয়াহ’র প্রচেষ্টা পুনরায় শুরু হয় নতুন উদ্যমে। এসময় যুগের চাহিদার দিকে লক্ষ্য করে প্রয়োজন পড়ে এই দাওয়াহ কে একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার। যার ফলশ্রুতিতে প্রতিষ্ঠিত হয় ইলমুদ-দাওয়াহ নামের একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্রনীতি। যার ভিত্তি হয় কুরআন-সুন্নাহের সঠিক জ্ঞান এবং খোলাফায়ে রাশিদিনের অনুসৃত মৌলিক নীতিমালার ওপর। মূলত মুসলমানদের মধ্যে এই চেতনার সার্বিক অনুপ্রেরণা দিয়েছে পবিত্র আল-কুরআন। যে কথা আল্লাহ তায়ালা এভাবে ব্যক্ত করেছেন,
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُوْنَ بِاللهِ۞
অর্থ : তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, যাদেরকে বের করা হয়েছে মানবজাতির কল্যাণের লক্ষ্যে। তোমরা মানুষকে সৎকাজের প্রতি আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে আর আল্লাহর প্রতি ইমান রাখবে। [সুরা আলে-ইমরান, আয়াত ১১০]
এরপর দাওয়াহ’র ওপর বিভিন্ন কিতাব রচিত হয়। দাওয়াহ’র জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেগুলো বিভিন্ন ব্যক্তি ও দলের অধীনে পরিচালিত হতে থাকে এবং তাদের নামেই পরিচিতি লাভ করে। আর তখনই এই ইলমে দাওয়াহ’র একটি সার্বজনীন পদ্ধতি ও সংস্কৃত শাস্ত্রীয় প্রয়োজনীয়তা আরও সুস্পষ্ট আকার ধারণ করে। কারণ কিছু কিছু ক্ষেত্রে দাওয়াতি কাজের পদ্ধতি এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু অস্পষ্টতা দেখা দেয়। এমনকি এই কাজের মূলনীতির মধ্যেও দেখা দেয় ত্রুটি। উপরন্তু পদ্ধতি ও উপকরণের ক্ষেত্রে ভুল এবং দুর্বলতা ধরা পড়ে।
দাওয়াহ’র শর‘য়ি অবস্থান
দাওয়াহ’র শর‘য়ি অবস্থান কী? এ নিয়ে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে ঐক্যমত স্থাপিত হয়েছে যে, দাওয়াহ ইলাল্লাহ কাজটি মৌলিকভাবে ফরজ। তবে তা কোন প্রকারের ফরজ- সে বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।
প্রথম দল বলেছেন : দাওয়াহ ইলাল্লাহ ফরযে আইন। প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর তা আঞ্জাম দেওয়া আবশ্যক। অন্যথায় ফরজ তরকের গুনাহে অভিযুক্ত হবে।
দ্বিতীয় দল বলেছেন : দাওয়াহ ইলাল্লাহ ফরযে কিফায়া। কোনো একজন মুসলমান আদায় করে নিলে তা থেকে অন্যরা দায়মুক্ত হতে পারে। যদি গোটা উম্মতের মধ্যে কেউই এই দায়িত্ব পালন না করে তবে সবাই সেই ফরজ তরকের অপরাধে অপরাধী হবে।
কুরআনের আলোকে প্রথম দলের প্রমাণপঞ্জি
১) আল্লাহ বলেন,
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ۞
অর্থ : তোমাদের প্রত্যেকেই এমন জাতি হবে, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে আর সৎকাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। [সুরা আলে-ইমরান, আয়াত ১০৪]
এই আয়াতটিতে (من) শব্দটি বয়ানের (ব্যাখ্যার) উদ্দেশ্যে এসেছে, কিছু অংশ বুঝানোর জন্য নয়। আর এটি নির্ধারণ করা হয়েছে অন্যান্য দলিলের ভিত্তিতে। সুতরাং প্রতিটি মুসলিম ব্যক্তির ওপর দাওয়াহ’র কাজ করা ফরজে আইন।
২) অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেন করেন :
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُوْنَ بِاللهِ۞
অর্থ : তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, যাদেরকে বের করা হয়েছে মানবজাতির কল্যাণের লক্ষ্যে। তোমরা মানুষকে সৎকাজের প্রতি নির্দেশ করবে, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে আর আল্লাহর প্রতি ইমান রাখবে। [সুরা আলে-ইমরান, আয়াত ১১০]
এই আয়াতে মুসলিম জাতির পরিচয় হিসেবে তাদের দাওয়াতি কাজকেই বড় ও প্রধান নিদর্শন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিদর্শন যেমন সংশ্লিষ্ট বস্তুর জন্য আবশ্যকীয় বিষয় তেমনি মুসলমানের জন্য দাওয়াহ’র কাজ অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ এবং ফরজ বিধান।
হাদিসের আলোকে প্রথম দলের প্রমাণপঞ্জি
৩) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :
مَنْ رَأٰمِنْکُمْ مُنْکَراً فَلْیُغَیِّرْہُ بِیَدِہ فَاِنْ لَّمْ یَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِہ فَاِنْ لَّمْ یَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِہ وَذَالِکَ اَضْعَفُ الْاِیْمَانِ (رواہ مسلم واصحاب السنن)
তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনো অপরাধমূলক কাজ দেখে থাকে তবে সে যেন তা স্বীয় হাত দিয়ে (সেই অপরাধকে) প্রতিহত করে। যদি তা করতে সক্ষম না হয় তবে যবানের মাধ্যমে। আর যদি এটাও তার জন্য সম্ভবপর না হয় তবে অন্তর দ্বারা ঘৃণা করবে। আর এটা হচ্ছে সব চাইতে দুর্বল ইমানের পরিচায়ক। [মুসলিম ও সুনান গ্রন্থ] এখানে(من) শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক, সুতরাং এর আওতায় সবাই অন্তর্ভুক্ত হবে।
৪) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ইরশাদ করেন :
لِیُبَلِّغِ الشَّاھِدُ الْغَا‏ئِبَ ، فَاِنَّ الشَّاھِدَ عَسیٰ اَنْ یُّبَلَّغَ مَنْ ھُوَ اَوْعیٰ لَہ مِنْہ
উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেয়। কেননা হতে পারে উপস্থিত ব্যক্তি এমন লোকের কাছে বিষয়টি পৌঁছাবে যে তার চাইতে অধিক মনে রাখতে পারে। [সহিহ বুখারি]
কুরআনের আলোকে দ্বিতীয় দলের দলিল
১) মহান আল্লাহ তায়ালার বাণী,
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُوْنَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ۞
অর্থ : তোমাদের মধ্য হতে একটি দল সংগঠিত হবে, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে। সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। [সুরা আলে-ইমরান, আয়াত ১০৪]
এখানে (مِنْ) শব্দটি কতক বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। যার প্রমাণ নি¤œ লিখিত দলিলসমূহ।
২) আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُوْنَ لِيَنْفِرُوْا كَافَّةً فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوْا فِي الدِّيْنِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوْا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُوْنَ
অর্থ : মুমিনরা সবাই একসঙ্গে বের হয়ে যাবে এটা সঙ্গত নয়। তাদের মধ্য থেকে প্রতিটি গোত্রের কিছু কিছু লোকের সমন্বয়ে একটি দল দীন সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের জন্য বের হয় না কেন? যেন তারা (শিক্ষা সমাপন করে) তাদের নিকট ফিরে এসে তাদেরকে সতর্ক করতে পারে। যেন তারা সতর্ক হয়ে যায়। [সুরা তাওবা, আয়াত ১২২]
৩) এ ছাড়াও স্বাভাবিকভাবে সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করতে গেলে যথেষ্ট জ্ঞান ও প্রজ্ঞা থাকতে হয়। আর তা অর্জন করা সকল মুসলমানের পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং এ কাজ করা তারই ওপর ওয়াজিব হবে যার মধ্যে উক্ত শর্ত পাওয়া যাবে, তখন অন্যরা পাপ থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে।
যে মতটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য
এখানে প্রাধান্যযোগ্য মত হলো প্রথমটি। অর্থাৎ দাওয়াতি কাজ করা প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির ওপর ফরজে আইন। তবে সেটা হতে হবে তার পরিসর ও সাধ্য অনুপাতে। (واللّہ اعلم)

অপরাপর প্রমাণসমূহের জবাব
আর দ্বিতীয় মতের পক্ষে উপস্থাপিত দলিলসমূহের জবাব হলো, আল্লাহ তায়ালার বাণী (وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ) এর মধ্যে (من) শব্দটি কতক বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়নি বরং তা বয়ান তথা ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং অর্থ হবে ‘তোমাদের প্রত্যেকেই …। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, (فاجتنبوا الرجس من الاوثان) অর্থ : তোমরা মূর্তিপূজার অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকো। [সুরা হজ, আয়াত ৩০]
আল্লামা ইবনে কাসির রহমাতুল্লাহি আলাইহি …. وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ আয়াতের তাফসিরে বলেন, এখানে উদ্দেশ্য হলো, এ জাতির মধ্যে এমন একটি দল থাকবে যারা দাওয়াহ’র কাজে সার্বিকভাবে নিয়োজিত থাকবে। যদিও জাতির প্রতিটি ব্যক্তির ওপর তার সাধ্যানুযায়ী এ কাজ করা ফরজ। যেমনটি হাদিসে ইরশাদ হয়েছে,
مَنْ رَأٰمِنْکُمْ مُنْکَراً فَلْیُغَیِّرْہُ بِیَدِہ فَاِنْ لَّمْ یَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِہ فَاِنْ لَّمْ یَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِہ وَذَالِکَ اَضْعَفُ الْاِیْمَانِ (رواہ مسلم واصحاب السنن)
তোমাদের যদি কেউ কোনো অপরাধমূলক কাজ দেখে তবে সে যেন তা স্বীয় হাত দিয়ে প্রতিহত করে। যদি তা করতে সক্ষম না হয় তবে যবানের মাধ্যমে। আর যদি এটাও তার জন্য সম্ভবপর না হয় তবে অন্তর দ্বারা ঘৃণা করবে। আর এটা হচ্ছে সর্বাধিক দুর্বল ইমানের পরিচায়ক। [মুসলিম ও অন্যান্য সুনান গ্রন্থ]
তাছাড়া প্রথম মতের পক্ষে আরও দলিল হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের কর্মপদ্ধতি। তারা সবাই ইসলামের শিক্ষা ও শিষ্টাচারের প্রতি মানুষকে দাওয়াত দিয়েছিলেন। রাত-দিন সর্বদা তারা একাজে নিয়োজিত ছিলেন। কখনও বিরত থাকেননি।
আল্লাহ বলেন,
قُلْ هٰذِه سَبِيْلِيْ أَدْعُوْ إِلَى اللهِ عَلٰى بَصِيْرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِيْ۞
বলুন! এটাই আমার পথ। আমি এবং আমার অনুসারীগণ বুঝে-শুনে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানিয়ে থাকি। [সুরা ইউসুফ, আয়াত ১০৮]
যখন মক্কা নগরী মুসলমানদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে গেল এবং বিশ^াসীগণ মক্কার কাফিরকর্তৃক অত্যাচারের স্টিমরোলারে অতিষ্ট হয়ে উঠলেন, খুঁজে পেলেন মদিনার আশ্রয়। মদিনার বিস্তীর্ণ এলাকা ও তার অধিবাসীরা নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সঙ্গী সাথীদের আহ্বান করলেন এবং তাদের জন্য নিরাপত্তা প্রদানের শপথ গ্রহণ করলেন। তখন মুসলমানদের নির্দেশ দেওয়া হলো মদিনায় হিজরত করার। উদ্দেশ্য, তারা সেখানে ইসলামের দাওয়াত দেবে, একত্র হয়ে পরস্পরে সাহায্য সহযোগিতা করবে। তাই মুমিনদের মধ্যে যারা হিজরত করেনি আল্লাহ তায়ালা তাদের তিরষ্কার করেছেন। বলেছেন,
إِنَّ الَّذِيْنَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِيْ أَنْفُسِهِمْ قَالُوْا فِيْمَ كُنْتُمْ قَالُوْا كُنَّا مُسْتَضْعَفِيْنَ فِيْ الْأَرْضِ قَالُوْا أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوْا فِيْهَا فَأُولَئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَسَاءَتْ مَصِيْرًا۞
অর্থ : নিশ্চয় যারা নিজেদের ওপর অত্যাচার করেছে ফিরিশতারা তাদেরকে মৃত্যুর সময় বলবে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলবে পৃথিবীতে আমরা দুর্বল ও অসহায় অবস্থায় ছিলাম। তখন তারা বলবেন, আল্লাহর দুনিয়া কি প্রশস্ত ছিল না? যেখানে তোমরা হিজরত করে চলে যেতে পারতে। এ লোকদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। আর (জাহান্নাম) কতই না খারাপ আবাসস্থল। [সুরা নিসা, আয়াত ৯৭]
যদি দাওয়াতি কাজ কিছুসংখ্যক লোকদের ওপর ফরজ হতো তবে নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং কয়েকজন মুসলমানের হিজরত করাই যথেষ্ট ছিল।
সুতরাং দাওয়তি কাজ সবার ওপর ফরজ এবং এতে উম্মতের সবাই একমত। প্রত্যেক ব্যক্তি তার নির্দিষ্ট স্থানে ও কর্মে থেকে তার সাধ্য অনুযায়ী দাওয়াতি কাজ করতে পারবে। প্রতিটি মানুষ তার পরিবার সন্তান স্ত্রীকে ইসলামের রশিকে মজবুতভাবে আঁকড়ে থাকার দাওয়াত দিতে পারে। তাদেরকে ফরজ-ওয়াজিব ও শিক্ষা-দীক্ষা মেনে চলার প্রতি আহ্বান করতে পারে। নিজ কর্ম ব্যবসা ও পেশায় থেকে দাওয়াতি কাজ করতে পারে।

দাওয়াহ’র গুরুত্ব
দাওয়াত মানুষের জীবনে অত্যন্ত আবশ্যকীয় একটি কাজ। এই কাজটির প্রয়োজনীয়তা ঠিক খাবার-দাবারের মতই আবশ্যক। কেননা মানুষ শরীরিক ও আত্মিক উপাদান দ্বারা গঠিত মহান আল্লাহ তায়ালার একটি অনবদ্য সৃষ্টি। আর এই উপাদান দুটির স্বাভাবিক স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজন খাদ্যের। শরীরের খাদ্য হলো, জীবিকা বা খাবার-দাবার। যা যমিন থেকে অনুসন্ধান করার জন্য আল্লাহ আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
هُوَ الَّذِيْ جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُوْلًا فَامْشُوْا فِيْ مَنَاكِبِهَا وَكُلُوْا مِنْ رِزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ۞
অর্থ : তিনিই তোমাদের জন্য যমিনকে সুগম করে রেখেছেন। কাজেই তোমরা তার দিগি¦দিকে চলাফেরা করতে থাকো এবং তার প্রদত্ত উপজীবিকা ভক্ষণ করতে থাকো। পুনরুত্থান তো তারই নিকট। [সুরা মুলক, আয়াত ১৫]
আর আত্মার খাদ্য হলো হেদায়েত এবং সত্যবিশ^াস অন্তরে লালন করা, তথা সঠিক পথে পরিচালিত হওয়া এবং ইমানের দৌলত লাভ করা। আর এই খাদ্যটি সরবরাহ করতে হয় আসমান থেকে। তাই এই দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালা নিজেই গ্রহণ করেছেন। তিনি আমাদের সঠিক পথের দিকনির্দেশনা দান করেছেন। তার ওহি ও প্রমাণপঞ্জিসহ আমাদের কাছে প্রেরণ করেছেন নবি ও রাসুল।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللهِ نُوْرٌ وَكِتَابٌ مُبِيْنٌ (১৫) يَهْدِيْ بِهِ اللَّهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلَامِ وَيُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوْرِ بِإِذْنِه وَيَهْدِيْهِمْ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيْمٍ۞
আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট আলোকবর্তিকা এবং সুস্পষ্ট কিতাব সমাগত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার মাধ্যমে লোকদের শান্তিময় পথে হেদায়াত দান করেন, যারা তার সন্তুষ্টি কামনা করে। তাদের তিনি স্বীয় অনুমতিক্রমে (কুফরের) অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করেন আনেন এবং সরল পথে পরিচালিত করেন। (সুরা মায়িদাহ, আয়াত ১৫-১৬)
সুতরাং দাওয়াহ প্রত্যেক মানুষের আবশ্যকীয় বিষয়। কারণ এটি তার আত্মার খাদ্য প্রদান করে এবং তাকে সৎকর্মপরায়ণতার প্রতি পরিচালিত করতে সাহায্য করে।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آَمَنُوْا اسْتَجِيْبُوْا لِلهِ وَلِلرَّسُوْلِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيْكُمْ وَاعْلَمُوْا أَنَّ اللهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِه وَأَنَّه إِلَيْهِ تُحْشَرُوْنَ۞
অর্থ : হে ইমানদারগণ! আল্লাহ এবং তার রাসূলের ডাকে সাড়া দাও। যখন তিনি তোমাদের আহ্বান করেন এমন বিষয়ের প্রতি যা তোমাদের জীবন দান করবে। (সুরা আনফাল, আয়াত ২৪) অতএব রাসুলগণের পর মুমিনদের একদল সে কাজগুলো করবে।
মানুষ বিবেক ও প্রবৃত্তির দ্বারা গঠিত। কিন্তু মানুষের বিবেক সব বিষয়ে সঠিকটা জানতে এবং বুঝতে অপারগ। আর তার প্রবৃত্তিও মানুষকে সব সময় সত্যের বিপরীত চলতে তাড়িত করে। আল্লাহ বলেন,
وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِيْ إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوْءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّيْ إِنَّ رَبِّيْ غَفُوْرٌ رَحِيْمٌ
অর্থ : আমি আমার আত্মাকে পবিত্র মনে করি না। নিশ্চয় আত্মা কুকর্মপ্রবণ। কিন্তু আমার প্রতিপালক যাকে অনুগ্রহ করেছেন।
(সুরা ইউসুফ, আয়াত ৫৩)
তাই এমন অবনত অবস্থাসম্পন্ন আত্মার জন্য প্রয়োজন হেদায়েতের সঠিক এবং পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। যেন মানুষ এর মাধ্যমে তার বিবেককে সঠিক পথের প্রতি দিকনির্দেশনা প্রদান করতে পারে এবং নিজেকে বিভ্রান্তি ও দুর্ভাগ্য থেকে সংরক্ষিত রাখতে পারে।
কল্যাণকর কোনো কাজ নিজে নিজেই চলতে পারে না। সৃষ্টির কেউ না কেউ তাকে বহণ করবে এবং বাস্তবায়ন করবে, আর এটাই স্বাভাবিক। কারণ আল্লাহর কখনও কোনো সময় বেকার থাকে না। তাই ‘দাওয়াহ’র নির্দেশনা পালন করার জন্য চাই এমন ব্যক্তিসত্তা, যে জাতিকে আহ্বান করবে সত্য ও সুন্দরের দিকে। যে হবে আল্লাহর পথে প্রদ্বীপ্ত সৈনিক এবং আল্লাহর দলভুক্ত আত্মোৎসর্গকারী নিবেদিত প্রাণ।
এ সম্পর্কে আল্লাহর বিশেষ বাণী-
أُولَئِكَ حِزْبُ اللهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللهِ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ۞
অর্থ : এরাই হলো আল্লাহর দলের লোক। জেনে রেখো আল্লাহর দলের লোকেরাই সফলকাম। (সুরা মুজাদালা, আয়াত ২২)
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,
قُلْ هَذِه سَبِيْلِيْ أَدْعُوْ إِلٰى اللهِ عَلٰى بَصِيرَْةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِيْ۞
অর্থ : বলুন! এটাই আমার পথ, আমি এবং আমার অনুসারীরা বুঝে শুনে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানিয়ে থাকি। (সুরা ইউসুফ, আয়াত ১০৮)
মানুষ ভালো বা মন্দ উভয় ধরনের কাজই করে থাকে। পুনরুত্থানের পর কিয়ামত দিবসে সেসব আমলের হিসাব-নিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তাই ওই সময় নাজাতের জন্য কি প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে সে সম্পর্কে সাম্যক ধারণা রাখা প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক। আর আল্লাহ তায়ালা স্বীয় অনুগ্রহ ও দয়ায় ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা জাতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন না যতক্ষণ পর্যন্ত সে জাতির কাছে সত্যের দাওয়াত ও তাওহিদের মর্মবাণী না পৌঁছে।
মহান আল্লাহর বাণী :
مَنِ اهْتَدٰى فَإِنَّمَا يَهْتَدِيْ لِنَفْسِه وَمَنْ ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِيْنَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُوْلًا۞
আমি ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো কওমকে আযাবে নিপতিত করবো না, যতক্ষণ না তাদের কাছে আমার রাসুল প্রেরণ করি। (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত ১৫)
তাই দাওয়াহ একটি অত্যাধিক জরুরি কাজ। এর মাধ্যমেই বুঝা যায় আল্লাহ মানুষকে কেন সৃষ্টি করেছেন। দাওয়াহ’র মাধ্যমে মানুষের জীবন সঠিকভাবে পরিচালিত হয় এবং দুনিয়া আখেরাতে মহান আল্লাহর ইনসাফ প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
নবুয়তি যুগের পর থেকে আজ পর্যন্ত মানুষকে অজ্ঞতা থেকে জ্ঞান দান করা এবং বিভ্রান্তি থেকে হেদায়েতের দিকে আহ্বান করা একটি অপরিহার্য বিষয়। কারণ প্রতিটি যুগেই তো এমন লোকের সমাগম হয়েছে যারা পথভ্রষ্ট, সীমালঙ্ঘনকারী ও সত্যকে প্রত্যাখ্যানকারী। এদেরকে সঠিক পথের দিশা দেওয়া, অনিষ্টতা থেকে সর্তক করা এবং সেই স্বার্থে বাতিলের অবস্থা উম্মতের সম্মুখে উন্মোচন করা আবশ্যক। তাই এই উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোকের প্রয়োজন যারা ইসলাম ও মুসলমানের দিকে ধেয়ে আসা এই ভয়ংকর যুদ্ধের মুকাবিলা করবে। যাদের ছোয়ায় জগতের সমস্ত পঙ্কিলতা পরিশুদ্ধ হয়ে, সকলের জীবন সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠবে।
দাওয়াহ’র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
১) ইসলামের নেতৃত্ব লাভ।
২) বাস্তব জীবনে ইসলামের সর্বোচ্চ প্রকাশ লাভ।
৩) পৃথিবীর বুকে ইসলামের প্রতিষ্ঠা লাভ।
৪) মানবজাতিকে পরিচালনা করার সক্ষমতা লাভ।
৫) ‘ইসলামই একমাত্র জীবনব্যবস্থা’ একথার প্রতি সর্বসম্মত মতবাদ প্রতিষ্ঠা লাভ।

দাওয়াহ’র মূলনীতি
দাওয়াহ’র উৎস :
দা‘ই তার দাওয়াতি কাজের নিয়ম-নীতি ও পদ্ধতি অনুসন্ধান করবে নি¤œলিখিত উৎসসমূহ থেকে।
১) পবিত্র কুরআনুল কারিম : দাওয়াহ‘র ক্ষেত্রে কোনো দা‘ইর জন্য এতটুকু জানাই যথেষ্ট যে, পবিত্র কুরআনই একমাত্র গ্রন্থ যাতে বিন্দুমাত্র ভুলের আশঙ্কা নেই। নেই কোনো সন্দেহের অবকাশ। এটি একটি মহান গ্রন্থ, যা শুধু সত্যের পয়গাম নিয়ে এসেছে। দা‘ই এখানে এমনসব আকিদা বিশ^াসের কথা পেয়ে যাবেন যা সকল মানুষের ফিতরাত তথা স্বভাবধর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর পাবে উন্নত জীবনের নিয়ম-নীতি। দাওয়াহ’র ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ইতিহাস এবং তাদের নবি-রাসুলদের পরিশ্রম আর কুরবানির বিশদ বিবরণ। এর মাধ্যমে দা‘ই তার ইমানকে মজবুত করতে পারে এবং বড় থেকে বড় পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারে।
২) সুন্নাতে নববি : প্রত্যেক দা‘ইকে সব দিক থেকে তো অবশ্যই বিশেষত দাওয়াহ’র ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পথ ও পদ্ধতি অনুসরণ করার প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি কীভাবে দাওয়াত দিয়েছেন, দাওয়াহ’র ক্ষেত্রে তার ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, হিকমত ও বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ কীরূপে ঘটেছে মোটকথা দা‘ইর জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতিটি কর্মপন্থাকে অনুসরণ ও অনুকরণ করতে হবে। কেননা দাওয়াহ ইলাল্লাহ এবং তার নির্দেশাবলির ক্ষেত্রে তারাই নীতি হচ্ছে বাস্তব উদাহরণ ও কুরআনের নির্দেশাবলির জীবন্ত ব্যাখ্যা।
৩) সালফে সালিহিনের জীবন-চরিত : সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রকৃত অনুসারী। সালফে সালিহিনের তালিকায় সর্বপ্রথম তাদেরই নাম আসে। এরপর আসে তাদের নাম যারা সাহাবায়ে কেরামকে উত্তমরূপে অনুসরণ করেছেন। শর‘ই পরিভাষায় যাদের ‘তাবেয়ি’ বলা হয়। দীনের জন্য তারা ছিলেন সর্বোচ্চ নিবেদিতপ্রাণ। তারা দীনের স্বার্থে নিজেদের জান-মাল, স্ত্রী-সন্তান সবকিছুকেই উৎসর্গ করেছিলেন। সুতরাং তাদের দাওয়াতি কাজের পন্থা আমাদের নমুনা বা আদর্শ হওয়ার যোগ্য।
৪) ইসলামিক ইতিহাসে ক্ষ্যাতিমান ওলামায়ে কেরাম ও দা‘ইদের অভিজ্ঞতা : যারা বাস্তবজীবনে আল্লাহর কুরআনকে প্রতিষ্ঠা করেছেন, প্রাণান্তকর পরিশ্রম এবং কঠিন অধ্যাবসায়ের বিনিময়ে হাদিস ও সুন্নাহকে সংরক্ষণ করেছেন। তাদের সারাটা জীবন কেটেছিল দীনের খিদমাত এবং সত্যকে সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে প্রাণপণ লড়ায়ের ময়দানে।
এরপর আমরা আলোচনা করবো দাওয়াহ’র রুকন সম্পর্কে।

দাওয়াহ’র রুকন
আভিধানিক অর্থ : দাওয়াহ‘র (رکن الدعوہ)স্তম্ভ, খুঁটি, কোন কিছুর মূলদ-।
পারিভাষিক অর্থ : দাওয়াহ‘র রুকন বলতে বুঝায় দাওয়াহ-কার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে যে সকল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দাওয়াহ তার প্রকৃত রূপ লাভ করে এবং যা ছাড়া দাওয়াহ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
দাওয়াহ‘র রুকন তিনটি :
১) দা‘ই বা যিনি দাওয়াহ‘র কাজ সম্পাদন করেন।
২) মাদ‘উ বা যাকে আহ্বান করা হয়।
৩) দাওয়াহ‘র বিষয়বস্তু।
পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে আমরা এই তিনটি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়াস পাবো ইনশাআল্লাহ।

দা‘ই (الداعی)
দা‘ইর পরিচয় :
আভিধানিক অর্থ : দা‘ই (الداعی) আহ্বানকারী, প্রচারকারী, দাবি উত্থাপনকারী।
পারিভাষিক অর্থ : দা‘ই (الداعی) সেই ব্যক্তিকে বলা হয়, যিনি নির্দিষ্ট কোনো মতবাদ বা ধর্মবিশ^াসের দিকে মানুষকে আহ্বান করেন। প্রকৃত ইসলাম এবং তার সঠিক শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। বিশেষত বাস্তবজীবনে তা প্রতিফলনের প্রচেষ্টা করেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِه وَسِرَاجًا مُنِيْرًا ۞وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِيْنَ بِأَنَّ لَهُمْ مِنَ اللَّهِ فَضْلًا كَبِيْرًا۞
হে নবি! আমি অবশ্যই আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে প্রেরণ করেছি আর (প্রেরণ করেছি) আল্লাহর আদেশক্রমে তার দা‘ই এবং উজ্জ্বল প্রদীপ স্বরূপ । [সুরা আহযাব, আয়াত ৪৫-৪৬]
দা‘ইর গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য
বিষয়গত দিক থেকে দা‘ইর গুরুত্ব : ইসলামে ‘দাওয়াহ’ যেহেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আর এই দাওয়াহ-কার্যই সম্পাদন হয় একজন দা‘ইর মাধ্যমে। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর তায়ালার দিকে দাওয়াহ দেন, তার সন্তুষ্টি এবং জান্নাতের প্রতি আহ্বান করেন। সুতরাং দাওয়ার ক্ষেত্রে দা‘ইর গুরুত্ব ও ফযিলত অপরিসীম।
মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلٰى اللهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِيْ مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ۞
অর্থ : সেই ব্যক্তির চেয়ে আর কার কথা উত্তম হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয় এবং সৎকাজ করে। আর বলে, আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত। [সুরা হামিম সাজদাহ, আয়াত ৩৩]
কর্মগত দিক থেকে দা‘ইর গুরুত্ব : দা‘ইর কাজ হচ্ছে সর্বোত্তম কাজ। কারণ এটা ছিল নবি-রাসুলদের কাজ। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানবসম্পদ যেহেতু তারাই ছিলেন, তাই তাদের কাজও সর্বকালের শ্রেষ্ঠ কাজ হওয়ার দাবিদার। এ দিক থেকে দেখলেও দা‘ই ব্যক্তির সম্মান ও মর্যাদা অন্য সাধারণ ব্যক্তিদের তুলনায় অনেক বেশি।
প্রতিদানের দিক থেকে দা‘ইর গুরুত্ব : দা‘ইর প্রতিদান কী হবে, সে কথা স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামিন তার পবিত্র কিতাবে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَنْ دَعَااِلٰی ھُدیً کَانَ لَہ مِنَ الْاَجْرِ مِثْلَ اُجُوْرِ مَنْ تَبِعَہ لَا یَنْقُصُ ذَالِکَ مِنْ اُجُوْرِھِمْ شَیْئاً۔ وَمَنْ دَعَا اِلٰی ضَلَالَہ کَانَ عَلَیْہِ مِنَ الْاِثْمِ مِثْلُ آثَامِ مَنْ تَبِعَہ۔ لَایَنْقُصُ ذَالِکَ مَنْ آثَامِہِمْ شَیْئاً (رواہ مسلم)
অর্থ : যে ব্যক্তি হেদায়েতের পথে দাওয়াত দেবে, সে তার অনুসরণকারীর প্রতিদানের সমপরিমাণ প্রতিদান পাবে। এতে তাদের (অনুসরণকারীদের) প্রতিদানের সামান্যতমও হ্রাস করা হবে না।
আর যে ভ্রষ্টতার পথে আহ্বান করবে, সে তার অনুসারীদের সমপরিমাণ গুনাহের অধিকারী হবে। এতে তাদের (অনুসরণকারীদের) পাপ সামান্যতমও কম করা হবে না। [মুসলিম শরিফ]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
فَوَاللّٰہِ لَاَنْ یَّھْدِیْ اللّٰہُ رَجُلاً وَاحِداً خَیْرٌ لَکَ مِنْ اَنْ یَّکُوْنَ لَکَ حُمْرُ النَّعَمِ۞
আল্লাহর কসম! আল্লাহ যদি তোমার দ্বারা একজন লোককে হেদায়েত করেন, তবে তা লাল উট পাওয়ার চেয়েও তোমার জন্য উত্তম হবে। [বুখারি ও মুসলিম]
দা‘ইর গুণাবলী
১) দাওয়াতি বিষয়ের প্রতি পূর্ণ বিশ^াস স্থাপন : দা‘ই যে কথার প্রতি দাওয়াহ দেবে সর্বপ্রথম সে কথার প্রতি দা‘ইর পূর্ণ ইমান, অটল বিশ^াস এবং গভীর দৃষ্টিপাত থাকতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يَا يَحْيَى خُذِ الْكِتَابَ بِقُوَّةٍ۞
অর্থ : হে ইয়াহইয়া! এ কিতাবকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধর। [সুরা মারিয়াম, আয়াত : ১২]
দাওয়াহ’র ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অব্স্থান ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। যা সকল প্রকার দ্বিধা-দ্বন্দের উর্ধ্বে। যখন কুরাইশ কাফিররা দাওয়াতি কাজ ছেড়ে দেওয়ার জন্য তাকে প্রস্তাব দিয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন,
اَتَرَوْنَ ھٰذِہ الشَمْسَ ؟ قَالُوْا : نَعَمْ، قَالَ مَا اَنَا بِاقَدْرِ عَلٰی اَنْ اَدْعُوَ لَکُمْ ذَالِکَ عَلٰی اَنْ تَسْتَشْعَلُوْا لِیْ مِنْھَا شُعْلَۃً ( رواہ الھیثمی و ابو یعلی)
অর্থ : তোমরা কি এই সূর্যটা দেখতে পাচ্ছো? তারা বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, যদি এই সূর্য থেকে আমাকে একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ এনে জালিয়ে দাও তবুও আমি দাওয়াহ’র কাজ পরিত্যাগ করতে প্রস্তুত নই। [হাইছামি ও আবু ইয়ালা]
২) আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের দৃঢ়তা অর্জন : দা‘ইর জন্য আল্লাহর সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপন করার কোনো বিকল্প নেই। যাতে করে তিনি প্রতিটি পদে আল্লাহর নিকট থেকে সাহায্য ও তাওফিকপ্রাপ্ত হন। প্রতিটি আমলে নিয়তকে খালিছ করতে হবে। বেশি বেশি ইবাদত ও যিকিরে মশগুল থাকতে হবে। বিভিন্ন ধরনের নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনের প্রচেষ্টা চালাতে হবে। শরিয়তে যেসব বিষয় নিষিদ্ধ তা থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। দা‘ই যখন এমন জীবন অতিবাহিত করেন তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য সকল বিষয় সহজ করে দেওয়া হয়। আল্লাহ তায়ালা নিজেই তাদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
এ প্রসঙ্গে হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত আছে,
مَایَزَالُ عَبْدِیْ یَتَقَرَّبُ اِلٰی بِالنَّوَافِلِ حَتّٰی اَحِبَّہ ۔ فَاِذَا اَحْبَبْتُہ ، کُنتُ سَعِمْتُ اَلَّذِیْ یَسْمَعُ بِہ ، وَبَصَرَہ اَلَّذِیْ یَبْصُرُبِہ، وَیَدَہ اَلَّتِیْ یَبْطِشُ بِھَا وَ رِجْلَہ اَلَّتِیْ یَمْشِیْ بِھَا، وَاِنْ سَاَلَنِیْ لَاَعْطَیْنٰہ، وَلَئِنِ اسْتَعَاذَبِیْ لَاُعِیْذَنَّہ (رواہ البخاری)
অর্থ : বান্দা যখন আমার নৈকট্য অর্জনের লক্ষ্যে ইবাদতের মাত্রা বৃদ্ধি করতে থাকে, এক পর্যায়ে আমি তাকে ভালোবেসে কাছে টেনে নিই। আর আমি যখন তাকে ভালোবাসি তখন আমিই তার শ্রবণশক্তি হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শ্রবন করে, আমি তার দৃষ্টি হয়ে যায় যার মাধ্যমে সে অবলোকন করে, আমি তার হাত হয়ে যাই যার মাধ্যমে সে কোনো কিছু ধারণ করে, আমি তার পা হয়ে যাই যার মাধ্যমে সে চলাচল করে থাকে। সে যদি আমার কাছে কোনো কিছু প্রার্থনা করে আমি অবশ্যই তাকে তা প্রদান করি। সে যদি আমার কাছে কোনো কিছু থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় প্রদান করি। [বুখারি]
৩) দাওয়াতি বিষয়ের প্রতি সাম্যক ধারণা থাকা : দা‘ই যে বিষয়ে দাওয়াহ প্রদান করবে সে সম্পর্কে তাকে সর্ব প্রথম বিজ্ঞ হতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
قُلْ هَذِهِ سَبِيْلِيْ أَدْعُوْ إِلٰى اللهِ عَلٰى بَصِيْرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِيْ۞
অর্থ : আপনি বলুন, এটাই আমার পথ। আমি আমার অনুসারীরা এ বিষয়ে বুঝে-শুনেই আল্লাহ তায়ালার দিকে আহ্বান করে থাকি।
দেখুন এই অজ্ঞ আবেদ ব্যক্তি কি কা- করেছে সেই ব্যক্তির সঙ্গে যে নিরানব্বইটি খুন করে তার কাছে এসেছিল তাওবা সম্পর্কে বিধান জানার জন্য.. [বুখারি ও মুসলিম]
৪) ইলম অনুপাতে আমল ও তার ওপর দৃঢ়ভাবে অবস্থান : দা‘ইর জন্য ইলম অনুযায়ী আমল করা এবং সঠিক চালচলনের ওপর দৃঢ় থাকা আবশ্যক। যে দা‘ই ইলম অনুযায়ী আমল করে না তার দ্বারা দীনের বিশেষ কোনো মঙ্গলের আশা করা যায় না। দা‘ইদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ যে দোষ পরিলক্ষিত হয় তা হলো, তাদের ইলম থেকে আমলের বিচ্ছিন্নতা। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آَمَنُوْا لِمَ تَقُولُوْنَ مَا لَا تَفْعَلُوْنَ ۞كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللهِ أَنْ تَقُوْلُوْا مَا لَا تَفْعَلُوْنَ۞
অর্থ : হে ইমানদারগণ! তোমরা যা করো না তা বলো কেন? আল্লাহর কাছে বড়ই ক্রোধের বিষয় যে, তোমরা যা (নিজে) করো না তা অপরকে (করতে) বলো। [সুরা সফ, আয়াত ১-২]
হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে,
یُوْتیٰ بِالرَّجُلِ یَوْمَ الْقِیَامَۃِ ، فَیُلْقیٰ فِیْ النَّارِ ، فَتَنْدَلِقُ اَقْتَابُ بَطَنِہ ، فَیَدُوْرُبِہَا کَمَا یَدُوْرُ الْحِمَارُ ، فَیَجْتَمِعُ اِلَیْہِ اَھْلُ النَّارِ، فَیَقُوْلُوْنَ: یَافُلَانُ مَالَکَ؟ اَلَمْ تَکُنْ تَأمُرُبِالْمَعْرُوْفِ وَتَنْہٰی عَنِ الْمُنْکَرِ؟ فَیَقُوْلُ بَلٰی کُنْتُ آمِرُ بِالْمَعْرُوْفِ وَلَا آتِیَہ وَاَنْھٰی عَنْ الْمُنْکَرِ آتِیَہ (متفق علیہ)
র্অথ : কিয়ামতের দিন জনৈক ব্যক্তিকে (আল্লাহর দরবারে) উপস্থিত করা হবে, এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। এতে তার পেটের নাড়ি-ভুড়ি বের হয়ে আসবে। এরপর সে তার চতুষ্পাশের্^ ঘুরতে থাকবে যেমন গাধা যাতার চতুষ্পাশের্^ ঘুরতে থাকে। তখন জাহান্নামবাসীরা তার কাছে এসে জমায়েত হয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করবে, হে অমুক! তোমার কী হয়েছে, এই অবস্থা কেন? তুমি না আমাদের সৎকাজের আদেশ করতে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করতে । সে বলবে, হ্যাঁ আমি সৎ কাজে আদেশ দিতাম কিন্তু তার ওপর নিজেই আমল করতাম না। আর অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করতাম ঠিক কিন্তু পরে আমি নিজেই তা করতাম। [বুখারি ও মুসলিম]
৫) সার্বিক বিষয়ে সচেতনতা অর্জন করা : দা‘ইর জন্য দাওয়াহ‘র পরিবেশ, প্রেক্ষাপট, স্থান ও যুগের চাহিদা সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান থাকা আবশ্যক। যাকে দাওয়াত দেওয়া হবে তার স্বভাব, পরিবেশ আনুসাঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিফহাল থাকা। এর ওপর ভিত্তি করেই তিনি দাওয়াহ’র পরিকল্পনা তৈরি করবেন এবং সে হিসেবেই নির্ধারিত করবেন কোন দাওয়াহ টি প্রথম দেবেন, কোনটি পরে, এভাবেই মূলত তাকে একটি বাস্তবসম্মত দাওয়াতি কার্যক্রম চালাতে হবে।
৬) হিকমত অবলম্বন : দাওয়াহ‘র পদ্ধতিতে হিকমত অবলম্বন করা। যিনি বা যাদের কাছে দাওয়াত উপস্থাপন করা হবে তাদের সামনে উপযুক্ত ও সুন্দর পন্থায় দাওয়াত উপস্থাপন করবে। প্রত্যেকটি বিষয় যথাস্থানে ব্যবহার করবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
ادْعُ إِلٰى سَبِيْلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِيْ هِيَ أَحْسَنُ۞
অর্থ : তোমার রবের পথে আহ্বান কর হিকমতের সঙ্গে এবং উত্তম নসিহতের মাধ্যমে। আর তাদের সঙ্গে উত্তম পন্থায় বিতর্ক করো। [সুরা নাহল, আয়াত ১২৫]
৭) চারিত্রিক উৎকর্ষতা সম্পন্ন হওয়া : একজন দা‘ইর জন্য সর্বোত্তম আচরণ-অভ্যাসে নিজেকে গড়ে তোলা দরকার। কারণ তার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক হতে হবে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও আন্তরিক। আর এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন সর্বোত্তম আচরণে উৎকর্ষম-িত হওয়া। দাওয়াহ’র স্বার্থে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উত্তম আচরণ হচ্ছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আল্লাহ তায়ালা তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চারিত্রিক বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন,
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ۞
অর্থ : নিশ্চয় আপনি সুমহান চরিত্রের অধিকারী। [সুরা কলম, আয়াত ৪]
আল্লাহ তায়ালা তার নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লামের কাছে উত্তম চরিত্রের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা এভাবে তুলে ধরেন-
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ۞
অর্থ : নিশ্চয় আপনি আল্লাহর অনুগ্রহে তাদের প্রতি বিন¤্র হয়েছেন। আপনি যদি কঠিন ও পাষাণ-হৃদয় হতেন তবে নিশ্চয় তারা আপনার নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতো। সুতরাং আপনি তাদেরকে ক্ষমা করুন। তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং উদ্ভূত সমস্যা নিয়ে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন। অতপর আপনি যে সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন সে ব্যাপারে আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। নিশ্চয় আল্লাহ তার ওপর নির্ভরশীল বান্দাদের ভালোবাসেন। [সুরা আলে-ইমরান, আয়াত ১৫৯]
সুতরাং দা‘ইর ওপর ওয়াজিব হচ্ছে নিজেকে সর্বোত্তম চরিত্রে সুসজ্জিত করা এবং খারাপ আচরণ থেকে হেফাজত থাকা। কারণ শিক্ষার মাধ্যমেই জ্ঞান হাসিল করা যায়। আর ধৈর্যশীলতার অনুশীলনের মাধ্যমেই অর্জন করা যায় ধৈর্য। অনুরূপ উত্তম চরিত্রেরও রয়েছে অনেকগুলো উপাদান, যার প্রতিটি উপাদান আয়ত্ব করার জন্য দা‘ইকে অবশ্যই চেষ্টা করতে হবে।
৮) মুসলমানদের প্রতি সু-ধারণা পোষণ করা : প্রতিটি মুসলমান ভালো, সৎ এবং চত্রিবান- এমন বিশ^াস দা‘ইর অন্তরে থাকতে হবে। কখনও কোনো মুসলিম সম্পর্কে বিরূপ ধারণা রাখা যাবে না, বরং তার বাহ্যিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে সুধারণা রাখবে। আর যা অন্তরালের বিষয়, গোপনীয় বস্তু, তা আল্লাহর ফয়সালার ওপর সোপর্দ করবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ۞
অর্থ : হে ইমনদারগণ! তোমরা বেশি বেশি ধারণা করা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয় কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধারণা করা অপরাধ। [সুরা হুজরাত, আয়াত ১২]
হাদিসে ইরশাদ হচ্ছে,
اِیَّاکُمْ وَالظَّنَّ فَاِنَّ الظَّنَّ اَکْذَبُ الْحَدَثَ (متفق علیہ)
অর্থ : তোমরা ধারণা করা থেকে সাবধান থাকবে। কেননা ধারণা করা সবচেয়ে মিথ্যা কথা। [বুখারি ও মুসলিম]
তবে মানুষের ওপর ভালো ধারণা রাখার অর্থ এই নয় যে, তাদের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে একেবারে উদাসীন থাকবে, তাদের ভুল-ত্রুটি দেখেও না দেখার ভান করে তা থেকে সম্পূর্ণরূপে চুপ থাকা। মূলত কারো ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করা ভালো ধারণার বিপরীত নয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آَمَنُوْا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَكُمْ فَاحْذَرُوْهُمْ وَإِنْ تَعْفُوْا وَتَصْفَحُوْا وَتَغْفِرُوْا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُوْرٌ رَحِيْمٌ۞
অর্থ : হে ইমানদারগণ! তোমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির মধ্যে থেকে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু রয়েছে। অতএব তাদের থেকে তোমরা সতর্ক থাকবে। [সুরা তাগাবুন, আয়াত ১৪]
৯) অপরের দোষ-ত্রুটি গোপন করা :
একজন দা‘ইর বিশেষ গুণ হলো, মানুষের দোষ-ত্রুটিকে গোপন রাখা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
إِنَّ الَّذِيْنَ يُحِبُّوْنَ أَنْ تَشِيْعَ الْفَاحِشَةُ فِيْ الَّذِيْنَ آَمَنُوْا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيْمٌ فِيْ الدُّنْيَا وَالْآَخِرَةِ۞
নিশ্চয় মুমিনদের মধ্যে যারা অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে তাদের জন্য রয়েছে ইহলোক ও পরলোকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [সুরা নুর, আয়াত ১৯]
হাদিসে বলা হয়েছে,
لَایَسْتُرُ عَبْدٌ عَبْداً فِیْ الدُّنْیَا اِلَّا سَتَرَہ اللّٰہُ یَوْمَ الْقِیَامَۃِ (رواہ مسلم)
অর্থ : দুনিয়াতে যে বান্দা অপর বান্দার দোষ গোপন রাখবে, কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তার দোষ গোপন রাখবেন। [মুসলিম]
একজন দা‘ইর দাওয়াতি কাজের উদাহরণ হচ্ছে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মতো। ডাক্তার চিকিৎসার ক্ষেত্রে অনেক গোপন বিষয় অবলোকন করে। কিন্তু তার জন্য আবশ্যক হলো, তা গোপন রাখা এবং বাইরে প্রকাশ না করা।
১০) সামাজিক জীবনে মধ্যমপন্থায় বিশ^াসী হওয়া : যখন মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করার পরিবেশ থাকবে তখন তাদের সংস্পর্শে যাবে। আর যখন দূরে থাকাই শ্রেয় মনে হবে তখন তাদের থেকে দূরেই অবস্থান করবে। কারণ দা‘ইর কাজের মধ্যে আবশ্যিক বিষয় হলো, তাকে সাধারণ মানুষের কাছে যেতে হবে, তাদের সঙ্গে মিশতে হবে। এতে করে তাদেরকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করা এবং অকল্যাণ থেকে নিষেধ করা তার জন্য অনেকটা সহজ এবং বাস্তবিক হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِيْنَ يَخُوْضُوْنَ فِيْ آَيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتّٰى يَخُوضُوْا فِيْ حَدِيْثٍ غَيْرِه ۞
যখন আপনি তাদেরকে দেখেন, তারা আমার আয়াত নিয়ে নিরর্থক আলোচনায় লিপ্ত থাকে তখন তাদের কাছে থেকে সরে যান যে পর্যন্ত তারা অন্য কথায় প্রবৃত্ত না হয়। [সুরা আনআম, আয়াত ৬৮]
হাদিসে এসেছে,
اَلْمُؤْمِنُ الَّذِیْ یُخَالِطُ النَّاسَ وَیَصْبِرُ عَلٰی اٰذَاھُمْ اَفْضَلُ مِنَ الْمُؤْمِنِ الَّذِیْ لَایُخَالِطُ النَّاسَ وَلَایَصْبِرُعَلٰی اٰذَاھُمْ (رواہ احمد و الترمذی، ابن ماجہ)
যে মুমিন মানুষের সঙ্গে মেশে এবং তাদের দেওয়া কষ্টের ওপর ধৈর্য ধারণ করে সে ওই মুমিনের চেয়ে উত্তম যে মানুষের সঙ্গে মেশে না এবং তাদের দেওয়া কষ্টের ওপর ধৈর্য ধারণ করতে পারে না। [আহমাদ, তিরমিযি ও ইবনে মাযাহ শরিফ]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বনি-ইসরাইলের মধ্যে সর্বপ্রথম যে দিক থেকে ত্রুটি অনুপ্রবেশ করে, তা ছিল খারাপ কাজে লিপ্ত সম্প্রদায় এবং পাপীদের সঙ্গে মেলামেশার ব্যাপারে কোনো নিয়ম মেনে না চলা। তাই দা‘ইর জন্য আবশ্যক, তাকে সামাজিকতার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা। তবে সেটাও হতে হবে প্রয়োজন অনুযায়ী।
বুদ্ধিমান ব্যক্তি মাত্রই জানেন, একজন ডাক্তার কোনো রোগীর চিকিৎসা করার সময় কী পরিমাণ সতর্কতা অবলম্বন করেন। কেন করেন? যেন সে রোগ তাকেও স্পর্শ না করে।
১১) প্রতিটি মানুষের অবস্থান সম্পর্কে সচেতনতা অর্জন : মানুষকে তার প্রাপ্য মর্যাদা প্রদান করা। সম্মানী ব্যক্তিকে সম্মান করা।
হাদিসে এসেছে,
اَمَرَنَا الرَّسُوْلُ اَنْ نُّنَزِّلَ النَّاسَ مَنَازِلَہُمْ (رواہ ابو داود)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, মানুষকে তাদের নির্দিষ্ট মর্যাদা দিতে।[আবু দাউদ, অবশ্য হাদিসটি দুর্বল]
হযরত আবু মুসা আশআরি রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
اِنَّ مِنْ اِجْلَالِ اللّٰہِ تَعَالٰی اِکْرَامَ ذِیْ شَیْبَۃِ الْمُسْلِمِ، وَحَامِلِ الْقُرْانِ غَیْرِ الْغَالِیْ فِیْہِ ، وِالْجَافِیْ عَنْہُ ، وَاِکْرَامَ ذِیْ السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ ـ (رواہ ابوداود)
অর্থ : নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালার সম্মান ও মহত্বের অন্তর্গত হচ্ছে এমন বয়জৈষ্ঠ্য মুসলিম যে কুরআন নিয়ে বাড়াবাড়ি করে না এবং তার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করে না এরূপ কুরআনের ধারক-বাহককে সম্মান করা এবং যে শাসক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে তাকে সম্মান করা। [আবু দাউদ]
সুতরাং দা‘ইর জন্য আবশ্যক হচ্ছে মানুষের অবস্থা, তাদের পর্যায়, জ্ঞান ও মর্যাদার ক্ষেত্রে পারস্পরিক পার্থক্যের প্রতি লক্ষ্য রাখা।
১২) নিজেদের মধ্যে সম্পর্কের অবস্থান দৃঢ় করা : দাওয়াতি কাজের স্বার্থে হলেও দা‘ইর জন্য অন্যান্য দা‘ইর সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা বজায় রাখতে হবে। তাদের থেকে পরামর্শ গ্রহণ করা এবং একে অপরের কল্যাণ কামনা করা আবশ্যক।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَتَعَاوَنُوْا عَلٰى الْبِرِّ وَالتَّقْوٰى وَلَا تَعَاوَنُوْا عَلٰى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ۞
অর্থ : তোমরা পরস্পরকে সৎ ও তাকওয়ার কাজে সহযোগিতা কর। পাপ ও শত্রুতার ব্যাপারে পরস্পরকে সহযোগিতা করো না। [সুরা মায়েদা, আয়াত ২]
হাদিসে বর্ণিত আছে,
اَلدِّیْنُ النَّصِیْحَۃُ، قُلْنَا : لِمَنْ؟ قَالَ : لِلّٰہِ ، وَلِکِتَابِہ وَلِرَسُوْلِہ وَ الِاَئِمَّۃِ الْمُسْلِمِیْنَ وَعَامَّتِہِمْ (رواہ مسلم)
অর্থ : দীন হচ্ছে নসিহতের (কল্যাণকামিতার) ওপর ভিত্তিশীল। আমরা আরজ করলাম, কার জন্য? তিনি বললেন, আল্লাহর জন্য, তার কিতাবের জন্য, তার রাসুলের জন্য, মুসলমানদের নেতৃবৃন্দ ও সাধরাণ মানুষের জন্য। [মুসলিম শরিফ]
এই শিষ্টাচারের মাধ্যমে দাওয়াহ‘র কাজে দা‘ইদের মধ্যে ভালোবাসা ও আন্তরিকতাকে গভীর করবে। পরস্পরের মধ্য হতে কুধারণা দূর করবে।
মাদ‘উ (مدعو)
মাদ‘উর পরিচয় :
আভিধানিক অর্থ : মাদ‘উ (مدعو), আহুত (যাকে ডাকা হয়েছে)
পারিভাষিক অর্থ : মাদ‘উ (مدعو) সেই ব্যক্তিকে বলা হয়, দা‘ই (الداعی) যার কাছে দাওয়াহ (الدعوۃ) পেশ করেন। চাই সে মুসলিম হোক
অথবা কাফের। পুরুষ হোক বা নারী। তবে দাওয়াহ’র ক্ষেত্রে মাদ‘উ বিভিন্ন স্তরের হতে পারে।

মাদ‘উর স্তরসমূহ
প্রথম ও সর্বোচ্চ স্তর : দাওয়াহ’র ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রগণ্য মাদ‘উ (مدعو) হচ্ছে, দা‘ইর সবচেয়ে বেশি নিকটে যে আছে। তাই একজন দা‘ইর জন্য সবচেয়ে নিকটবর্তী সত্তা হচ্ছে তার নিজের নফস।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَأَنْذِرْ عَشِيْرَتَكَ الْأَقْرَبِيْنَ ۞
অর্থ : এবং আপনার নিকটতম ব্যক্তিদেরকে ভীতি প্রদর্শন করুন। [সুরা শুআরা, আয়াত ২১৪]
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে,
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا ۞وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا۞
অর্থ : নিশ্চয় যে নিজেকে শুদ্ধ করে সে সফলকাম হয় এবং যে নিজেকে কলুষিত করে সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। [সুরা আশ-শামছ, আয়াত ৯-১০]
দ্বিতীয় স্তর : মাদ‘উ (مدعو) দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে দা‘ইর পরিবারবর্গ এ ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آَمَنُوْا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيْكُمْ نَارًا۞
অর্থ : হে ইমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর। [সুরা তাহরিম, আয়াত ৬]
তৃতীয় স্তর : দা‘ই যখন উপরোক্ত দুই স্তরে দাওয়াহ’র কাজ সম্পন্ন করবেন তখন তাকে অপরাপর আত্মীয়-স্বজনের নিকট দাওয়াহ’র কাজ পরিচালনা করতে হবে।
চতুর্থ স্তর : মাদ‘উর চতুর্থ স্তর হচ্ছে, দা‘ইর প্রতিবেশী ও অন্যান্য লোকেরা।
কিন্তু দেখা যায়, অনেক দা‘ই আছেন যারা দূরের লোকদের দাওয়াহ’র ব্যাপারে গুরুত্ব প্রদান করলেও নিজের ও আত্মীয়-স্বজনের কথা বেমালুম ভুলে যান। এদের কাছে দাওয়াহ’র কাজ করাকে নিজের দায়িত্বের বাহিরে মনে করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
أَتَأْمُرُوْنَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ أَنْفُسَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُوْنَ الْكِتَابَ أَفَلَا تَعْقِلُوْنَ
অর্থ : তোমরা কি মানুষদের সৎকর্মের নির্দেশ দাও? আর নিজেরা নিজেদের ভুলে থাকো? অথচ তোমরা কিতাব পাঠ কর, তবুও কি তোমরা চিন্তা করবে না? [সুরা বাকারা, আয়াত ৪৪]
মাদ‘উর হক
দাওয়াহ কৃত ব্যক্তির কিছু দাবি-দাওয়া রয়েছে। তৎসঙ্গে তার জন্য কিছু বিষয় ওয়াজিবও রয়েছে। মাদ‘উর সর্বাধিক হক হচ্ছে, দাওয়াহ’র মধ্যে তাকে উদ্দেশ্য করা। তার কাছে দাওয়াত উপস্থাপন করা অথবা তার কাছে দা‘ই প্রেরণ করা। মাদ‘উর কাছে দাওয়াত প্রদান যেন হঠাৎ করে যেন-তেন পদ্ধতিতে না হয়। আল্লাহ তায়ালা মানুষের কাছে রাসুলদের এমনভাবে পাঠিয়েছেন যেন তারা লোকদেরকে তাদের প্রাপ্য সঠিকভাবে বুঝিয়ে দিতে পারেন। ফলে তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার পক্ষে দলিল-প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করা ইনসাফের মানদ-ে সঠিক হয়।
আল্লাহ বলেন,
وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِيْنَ حَتّٰى نَبْعَثَ رَسُوْلًا۞
অর্থ : রাসুল না পাঠিয়ে আমি কোনো জাতিকে আযাব দেই না। [সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত ১৫]
এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সা.-এর অবস্থান
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিকটাত্মীয় লোকদের দাওয়াহ দিতে গিয়ে দূরের লোকদের কথা ভুলে যাননি। তেমনি নেতৃত্বস্থানীয় লোকদের দাওয়াহ দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ থেকে বিমুখ হননি। ইজতিহাদের ভিত্তিতে এর ব্যত্যয় কিছু ঘটলে সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা তাকে সতর্ক করেছেন।
عَبَسَ وَتَوَلّٰى ۞ أَنْ جَاءَهُ الْأَعْمٰى ۞وَمَا يُدْرِيْكَ لَعَلَّهُ يَزَّكَّى ۞ أَوْ يَذَّكَّرُ فَتَنْفَعَهُ الذِّكْرٰى۞
অর্থ : তিনি ভ্রুকুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন এই কারণে যে, তার কাছে একজন অন্ধ ব্যক্তি আগমন করেছে। আপনি কি জানেন? সে হয়তো পরিশুদ্ধ হতো অথবা উপদেশ গ্রহণ করতো এবং সে উপদেশ তার কোনো কল্যাণে আসতো। [সুরা আবাসা, আয়াত ১-৪]
এরপর থেকে তার এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। এমনকি হজের মওসুমে খাযরায গোত্রের ছয়জন লোক যখন মাথা মু-াচ্ছিলেন তখনও তিনি তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের সঙ্গে সাক্ষাত করে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন। আল্লাহ তায়ালার ফযলে তারা বাইয়াতে আকাবায় অংশগ্রহণ করেন এবং তাদের মাধ্যমেই ইসলামের ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক স্থাপিত হয়। অথচ সে সময় অনেক নেতৃস্থানীয় লোক ও সম্ভ্রান্ত সমাজ তার দাওয়াহ কে উপেক্ষা করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল।

মাদ‘উর দায়িত্ব
মাদ‘উর ওপর সবার্ধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে সত্যের আহ্বানে সাড়া দেওয়া। এক্ষেত্রে কোনো বাধাদানকারী যেন তাকে বাধা প্রাদান করতে না পারে সে দিকে তীক্ষè দৃষ্টি রাখা মাদ‘উর দায়িত্ব ও কর্তব্য।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ۞
অর্থ : মুমিনদের বক্তব্য শুধু এতটুকুই, যখন তাদের মধ্যে কোনো কিছু ফয়সালা করার জন্য আল্লাহ ও রাসুলের দিকে তাদের আহ্বান করা হয় তখন তারা বলে, আমরা শুনলাম ও আদেশ মান্য করলাম। তারাই সাফল্যবান। [সুরা নুর, আয়াত ৫১]
মাদ‘উর প্রকারভেদ
মানুষের প্রকারভেদ সম্পর্কে শরিয়তের বাণীসমূহ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, মানুষ মূলত দুই বিভাগে বিভক্ত।
প্রথম বিভাগ : মুমিন ও মুসলমান। শরিয়তের পরিভাষায় যাদের বলা হয় (امۃ الاستجابہ) দাওয়াহ গ্রহণকারী জাতি।
দ্বিতীয় বিভাগ : কাফির ও মুশরিক। শরিয়তের পরিভাষায় এদের বলা হয় (امۃ الدعوۃ) (আহুত সম্প্রদায়) দাওয়াহ কৃত জাতি।

মাদউর প্রথম বিভাগের প্রকারভেদ
প্রথম বিভাগের মাদ‘উ আবার দুই প্রকার।
১) ইসলামের হেদায়তপ্রাপ্ত, কিন্তু আকিদাগতভাবে বিভ্রান্ত।
২) দীনকে আঁকড়ে ধরে রাখার ব্যাপারে শক্তিশালী অথবা দুর্বল ব্যক্তি।
এরা আবার তিনভাগে বিভক্ত :
ক) সৎকাজে প্রতিযোগিতাকারী, এরা হলেন সৎকর্মপরায়ণ (صالح)
খ) যারা নিজেদের ওপর আত্যাচারকারী, গুনাহে লিপ্ত। এদের ফাসেক অথবা পাপী বলা হয়।
গ) কিছু মুসলমানেরা আছেন যারা পূর্ববর্তী দুই দলের মধ্যবর্তী অবস্থানে চলাফেরা করেন।
এই তিন দলের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
ثُمَّ أَوْرَثْنَا الْكِتَابَ الَّذِينَ اصْطَفَيْنَا مِنْ عِبَادِنَا فَمِنْهُمْ ظَالِمٌ لِنَفْسِه وَمِنْهُمْ مُقْتَصِدٌ وَمِنْهُمْ سَابِقٌ بِالْخَيْرَاتِ بِإِذْنِ اللهِ ذَلِكَ هُوَ الْفَضْلُ الْكَبِيْرُ
অর্থ : অতপর আমি তাদেরকে কিতাবের অধিকারী বানিয়েছি, যাদেরকে আমি আমার বান্দাদের মধ্যে মনোনিত করেছি। তাদের কেউ কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ কেউ মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর নিদের্শক্রমে কল্যাণের পথে এগিয়ে গিয়েছে।
[সুরা ফাতির, আয়াত ৩২]
এদের মধ্যে দাওয়াহ-কার্য পরিচালনার পদ্ধতি : অতএব উল্লিখিত প্রকারগুলোর মধ্যে কোনো কোনো লোকের মধ্যে কাফির ও মুনাফিকের দু-একটা গুণাগুণ ও ক্রিয়াকর্ম অবলোকন করা যায়। তাই প্রত্যেক প্রকারের লোকদের মাঝে তাদের অবস্থা অনুযায়ী দাওয়াহ‘র কাজ আঞ্জাম দিতে হবে। যেমন- সৎকর্মশীল ব্যক্তিকে আরও বেশি সৎকাজ করার প্রতি অনুপ্রাণিত করতে হবে। সেই হিসেবে তাকে দাওয়াত দিতে হবে। অনুরূপ যারা আকিদাগতভাবে বিভ্রান্ত তাদের শুদ্ধ আকিদার দিকে বৃদ্ধিবৃত্তিকভাবে আহ্বান করতে হবে। সত্যকে সুন্দর পন্থায় কুরআন ও হাদিসের আলোকে ফুটিয়ে তুলতে হবে।

মাদ‘উর দ্বিতীয় বিভাগের প্রকারভেদ
দ্বিতীয় বিভাগের মাদ‘উ আবার কয়েক ভাগে বিভক্ত।
১) ¯্রষ্টার অস্তিত্বকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকারকারী ‘নাস্তিক’ : যারা আল্লাহর অস্তিত্বকে কোনো ভাবেই স্বীকার করে না। বস্তুবাদী ও প্রকৃতিবাদীদের অবস্থান হলো এই পর্যায়ের।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَقَالُوْا مَا هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوْتُ وَنَحْيَا وَمَا يُهْلِكُنَا إِلَّا الدَّهْرُ
তারা বলে, আমাদের পার্থিব জীবনই তো শেষ। আমরা মৃত্যুবরণ করি এবং জীবিত হই। মহাকালই আমাদের ধ্বংস করে। [সুরা জারিয়া, আয়াত ২৪]
কমিউনিস্টদের এমনটাই মতবাদ। তারা বলে, পৃথিবীতে মাবুদ বলতে কোনো কিছু নেই। দুনিয়াতে বেঁচে থাকাটাই আসল জীবন। জীবনের অস্তিত্ব এখান থেকেই শেষ।
২) মূর্তিপূজক তথা মুশরিক : যারা আল্লাহর সঙ্গে আরও অনেককে শরিক করে। তাদের প্রতি বিশ^াস স্থাপন করে, ইবাদত করে।
তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَالَّذِيْنَ اتَّخَذُوْا مِنْ دُوْنِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُوْنَا إِلَى اللهِ زُلْفٰى إِنَّ اللهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيْهِ يَخْتَلِفُونَ إِنَّ اللهَ لَا يَهْدِيْ مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ۞
অর্থ : আর যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে নিয়েছে এবং বলে যে, আমরা তাদের ইবাদত এই উদ্দেশ্যে করি যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে তাদের পরস্পর বিরোধপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করে দেবেন। আল্লাহ মিথ্যাবাদী কাফেরদের সৎপথে পরিচালিত করেন না। [সুরা যুমার, আয়াত ৩]
উল্লিখিত দুই প্রকারের কাফেরই মৌলিকভাবে আল্লাহকে অস্বীকারকারী। তারা কুফর, শিরক ও অস্বীকারের ওপর প্রতিপালিত হয়েছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ মুরতাদও বটে। (মুরতাদ বলা হয়, যে মুসলমান ছিল কিন্তু পরবর্তীকালে আবার কাফির হয়ে গিয়েছে।
৩) আহলে কিতাব : যারা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের অনুসারী কিন্তু ইসলামের ওপর ইমান আনেনি। এরা তাওরাত ও ইনযিল কিতাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাই এদেরকে বলা হয় আহলে কিতাব। তবে সত্য কথা হলো, তাওরাত ও ইনযিলের সঠিক শিক্ষার ওপর এখন আর তারা নেই। তাদের মধ্যে অনেকে শিরক ও মুর্তিপূজায় লিপ্ত রয়েছে।
৪) মুনাফিক : এরা অন্তরে কুফরি রেখে বাইরে ইসলামের কথা প্রকাশ করে। কাফিরদের চেয়েও এদের অবস্থা অত্যন্ত ভয়ানক। কারণ তাদের প্রকৃত বিষয়টি মানুষের নিকটে অস্পষ্ট ও ধোকাপূর্ণ। এ জন্য অন্যদের চেয়ে এদের শাস্তি অনেক বেশি।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
إِنَّ الْمُنَافِقِيْنَ فِيْ الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَنْ تَجِدَ لَهُمْ نَصِيْرًا
অর্থ : নিশ্চয় মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিন্মস্তরে নিমজ্জিত হবে। আর তাদের জন্য কখনই কোনো সাহায্যকারী পাবে না। [সুরা নিসা, আয়াত ১৪৫]
এদের মাঝে দাওয়াতি কাজ করার পদ্ধতি : উল্লিখিত প্রত্যেক প্রকারের মানুষদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন বিধান রয়েছে। তবে প্রথমিকভাবে প্রত্যেকের কাছে এক আল্লাহর প্রতি ইমান আনয়ন এবং কুফর ও শিরক বর্জন করার জন্য আহ্বান করতে হবে।
দাওয়াহ’র বিষয়বস্তু
মূলত দাওয়াহ’র বিষয়বস্তু হচ্ছে ‘ইসলাম’। অর্থাৎ দীনের নিরঙ্কুশ বিশ^াস, ভারসাম্যপূর্ণ মূলনীতি ও সার্বিক মূল্যবোধ সম্পর্কে মাদ‘উর সচেতনতা সৃষ্টিই দাওয়াহ’র মূলকথা। স্বাভাবিকভাবে ইসলামের তিনটি বিষয় বা দিক থেকে দাওয়াহ’র কাজ সম্পাদন করতে হয়।
১) আকিদাগত দিক : ইসলামি আকিদার স্বরূপ হচ্ছে ইমান এবং তার ৬টি রুকন। আর এর অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে আকিদাহ সংক্রান্ত সকল বিষয় যার সুস্পষ্ট বাণী উদ্ধৃত হয়েছে কুরআন ও হাদিসে।
২) শরয়ি দিক : শরিয়তের মৌলিক রূপ-রেখা ফুটে ওঠে তার ‘৫টি রুকনের’ মাধ্যমে। ইসলামের যাবতীয় হুকুম-আহকামও এর মধ্যে নিহিত, চাই সেটা ব্যক্তি সম্পর্কিত বিষয় হোক বা পারিবারিক বা সাধারণ বিষয় হোক।
৩) চারিত্রিক দিক : চারিত্রিক দিক বলতে এখানে মানুষের সর্বোচ্চ সুন্দর ও সম্মানিত গুণাবলীর কথাই বলা হয়েছে। সুস্থ মানসিকতা, মার্জিত আচরণ, সুশৃঙ্খল জীবনরীতি এবং ব্যক্তি জীবনের যেসব বিষয়ে ইসলাম মানুষকে শিক্ষা দিয়েছে।
দাওয়াহ’র পদ্ধতি (طریقۃ الدعوۃ)
সংজ্ঞা
পারিভাষিক অর্থে দাওয়া’র পদ্ধতি বলতে সেসব পন্থাকেই বুঝানো হয়েছে যা দাওয়াহ’র ক্ষেত্রে একজন দা‘ই অবলম্বন করে থাকেন।
দাওয়াহ’র পদ্ধতির প্রকারভেদ
বিভিন্ন পদ্ধতিতে দাওয়াহ‘র কাজ পরিচালনা করা সম্ভব। তবে এখানে আমরা দাওয়াহ’র কয়েকটি মৌলিক পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
ادْعُ إِلَى سَبِيْلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِيْ هِيَ أَحْسَنُ۞
তোমার রবের পথে হিকমত ও সুন্দর নসিহতের মাধ্যমে আহ্বান কর আর তাদের সঙ্গে উত্তম পন্থায় বিতর্ক কর। [সুরা নাহাল, আয়াত ১২৫]
এই পদ্ধতিগুলোর মধ্যে থেকে কয়েকটি আমরা পর্যায়ক্রমে উল্লেখ করছি-

প্রথম পদ্ধতি
হিকমত
সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ : প্রজ্ঞা, জ্ঞান, সদার্থ ইত্যাদি।
পারিভাষিক অর্থে : হিকমত হচ্ছে, প্রত্যেক বস্তুকে তার নির্দিষ্ট ও উপযুক্ত স্থানে স্থাপন করা। অথবা হিকমত কার্যপ্রণালীকে বলে যাতে বিবেক ও জ্ঞান দ্বারা প্রাপ্ত সত্যকে উপলব্ধি করে তদানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
হিকমত প্রকাশের ক্ষেত্রসমূহ
যেহেতু হিকমতের মূলকথা হচ্ছে, কথা এবং কাজে সঠিক পন্থা অবলম্বন করা এবং সত্যকে সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করা সেহেতু হিকমতের দৃশ্যপট কয়েকটি। যেমন-
১) প্রতিটি বিষয়ের পূর্বাপর ধারাবাহিকতা নির্ণয় করা : কোন বিষয়টি কার আগে হবে, আর কোনটি কার পরে হবে সেটা সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা। সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর প্রাধান্য দেওয়া। যেমন আকিদা সংক্রান্ত বিষয়গুলো ইবাদত ও চারিত্রিক বিষয়গুলোর ওপর প্রাধান্য দেওয়া। ফরয বিষয়গুলোকে নফল ও মুস্তাহাবের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া। মাকরুহ বিষয়গুলোর চাইতে হারাম বিষয়গুলোর আলোচনা আগে করা। কোনো বিরোধের সময় সীমিত উপকারের চাইতে ব্যাপক উপকারকে প্রাধান্য দেওয়া। কোনো উপকারী বিষয় উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে তার ক্ষতিকারক দিকগুলো প্রতিহত করা।
এসব বিষয়ে আমাদের সম্মুখে সর্বোত্তম নমুনা হচ্ছে, প্রাথমিক যুগে ইসলামি দাওয়াহ’র বাস্তব কর্মপদ্ধতি। কারণ ইসলাম শুরু হয়েছে আকিদাগত ভিত্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তারপর পর্যায়ক্রমে শরিয়তের বিধানসমূহ বর্ণিত হয়েছে।
প্রমাণস্বরূপ : হযরত মুয়াজ রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর হাদিস। বিশেষত যে হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কিভাবে দাওয়াত দিতে হবে সে শিক্ষা দিয়েছেন। প্রথমে ইমান, তারপর সালাত, অতপর যাকাত। [হাদিসটি বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে]
২) প্রাথমিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়া : সাধারণত হিকমতের দাবি হলো উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সন্তর্পণে অগ্রসর হওয়া, অধিক জোশে হুশ না হারানো। সুতরাং কারো ব্যক্তিগত অথবা ব্যাপক বিষয়ে সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে দাওয়াতি পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কারণ পবিত্র কুরআন বিভিন্ন ফরয ও হারাম বিষয়ের ক্ষেত্রে ক্রমান্নয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। এ বিষয়ে খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আযিয রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন যথাযথ অনসরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি তার সময়ে তার ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রভূত সংস্কারকার্য সম্পাদন করতে সক্ষম হয়েছিলেন এই ঐতিহাসিক পদ্ধতি অবলম্বন করে। বলা বাহুল্য, তার এই সংস্কারধর্মী পরিবর্তন এসেছিল পর্যায়ক্রমে, একে একে।
৩) দাওয়াহ’র নীতি ও পদ্ধতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান, বয়স এবং স্তরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। দুর্বল ও সবল উভয় অবস্থাকে বরাবর ভাবলে হবে না। অনুরূপ যুদ্ধ ও শান্তি উভয়কে একরকম মনে করলে চলবে না। অনুরূপ ছোটকে বড়র সঙ্গে এবং নারীকে পুরুষের সঙ্গে তুলনা একবরাবর ভাবলে হবে না। শিক্ষিত ও অজ্ঞ লোককে এক পাল্লায় মাপলে চলবে না। শত্রু ও মিত্র উভয়ের সঙ্গে একই আচরণ করা যাবে না। এরকম আরও অনেক অবস্থা এবং স্তর রয়েছে যেগুলোর মধ্যে পারস্পরিক পার্থক্য ও সামঞ্জস্যতা খেয়াল করে দাওয়াহ’র কাজ করতে হবে।
একটি হাদিসে এসেছে,
یَاعَائِشَۃُ! لَوْلَاقَوْمُکَ حَدِیْثَ عَہْدِھِمْ بِکُفْرٍ، لَنَقَضْتُ الْکَعْبَۃَ فَجَعَلْتُ لَھَا بَابَیْنِ، بَابٌ یَدْخُلُ النَّاسُ وَبَابٌ یَّخْرُجُوْنَ ( متفق علیہ)
অর্থ : হে আয়শা! যদি তোমার কওমের লোকদের কুফর থেকে ফিরে আসার অবস্থা নতুন না হতো তবে বর্তমান কাবা ভেঙ্গে ফেলতাম এবং নতুনভাবে তৈরি করে তাতে দুটি দরজা দিয়ে রাখতাম। একটি দিয়ে লোক প্রবেশ করতো, অন্যটি দিয়ে বের হতো। [বুখারি, মুসলিম]
৪) ইহতিসাব করা : অর্থাৎ আমর বিল মা‘রুফ ও নাহি আনিল মুনকারের স্তর সমূহরে প্রতি ভিত্তি করে দাওয়াহ‘র পরিচালনা করবে। যেমন প্রথমে পরিচয় প্রদান করবে। তারপর ওয়াজ-নসিহত করবে। তারপর কঠোর বাক্য প্রদান করবে, ধমকি দিবে। এরপরেও যদি কাজ না হয় তবে সক্ষমতা থাকলে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে। প্রয়োজনে প্রহার পর্যন্ত যাওয়া যেতে পারে। এ-ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَاللَّاتِيْ تَخَافُوْنَ نُشُوْزَهُنَّ فَعِظُوْهُنَّ وَاهْجُرُوْهُنَّ فِيْ الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوْهُنَّ
অর্থ : আর তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে থেকে যাদের ব্যাপারে অবাধ্যতার আশঙ্কা কর, তাদের সদুপদেশ দাও। অতপর তাদের শয্যা পৃথক করে দাও। অতপর প্রহার কর। [সুরা নিসা, আয়াত ৩৪]
নাহি আনিল মুনকারের ক্ষেত্রে সাবধানতা
নাহি আনিল মুনকারের ক্ষেত্রে সাবধানাত অবলম্বন করা হিকমতেরই একটি বিশেষ অংশ। ইমাম ইবনুল কাইয়ুম বলেন, নাহি আনিল মুনকারের স্তর তিনটি।
১) একটি অপরাধকে প্রতিহত করতে গিয়ে যদি এর চেয়ে আরও বড় কোনো অপরাধ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে তবে এ ক্ষেত্রে তার প্রতিহত করা কোনোভাবেই জায়েয নেই।
২) যদি কোনো গর্হিত কাজ প্রতিহত করতে গিয়ে তার সমপরিমাণ অন্য কোনো গর্হিত কাজ প্রতিষ্ঠা হওয়র আশঙ্কা থাকে তবেও সেখানে প্রতিহত করা জায়েয নেই।
৩) আর যদি সেটা প্রতিহত করতে গিয়ে তা নির্মূল হওয়া অথবা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে তবে সেখানে নাহি আনিল মুনকার তথা অসৎ কাজকে প্রতিহত করা ওয়াজিব।
যদি কেউ উল্লিখিত স্তরসমূহ লঙ্ঘন করে তবে দাওয়াহ’র ক্ষেত্রে তা হিকমত এবং ইহতিসাবের বাইরে বলে গণ্য হবে।
৫) দাওয়াহ প্রদানের কারণ এবং দাওয়াহ’র প্রতি উদ্বুদ্ধকারী বিষয়গুলো অনুসন্ধান করা : এতে চিকিৎসার পদ্ধতি নির্ধারণ করতে সহজ হয়। কারণ দাওয়াহ’র ক্ষেত্রে অজ্ঞ ব্যক্তির সঙ্গে যেমন ব্যবহার হবে শত্রুর সঙ্গে তার কিছুটা ভিন্নতা হবে। দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে যেমন হবে অস্বীকারকারী এবং সীমালঙ্ঘনকারীর চিকিৎসা অন্যরকম হবে।
৬) পরিবেশ পরিস্থিতির প্রতি তীক্ষè নজর রাখা : এককভাবে এবং জামাতবদ্ধভাবে দওয়াহ‘র কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অবস্থা ও পরিবেশের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। কারণ দাওয়াহ’র পদ্ধতি বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন রকমের হতে পারে। যেমন, মুসলিম রাষ্ট্রে অথবা চুক্তিবদ্ধ রাষ্ট্রে দাওয়াতি কাজের হিকমত হলো, সরকার কর্তৃক অনুমদিত সংগঠনের মাধ্যমে হতে হবে। আর অমুসলিম দেশে কিংবা যে দেশের সঙ্গে কোনো চুক্তিবদ্ধতা নেই সেখানে গোপন সংগঠনের মাধ্যমে দাওয়াতি কাজ এগিয়ে নিতে হবে। আর কোনটা কাফির রাষ্ট্র, কোনটা মুসলিম রাষ্ট্র অথবা কোনটা ফাসিক রাষ্ট্র এসব বিষয় নির্ধারণ হবে উম্মতে মুসলিমার ওলামায়ে কেরাম কর্তৃক গঠিত কার্যকরী পরিষদ।
৭) দা‘ইর জন্য চারিত্রকভাবে সর্বোত্তম গুণাবলীর অধিকারী হওয়া : হিকমতের আন্তর্গত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দা‘ই চারিত্রিকভাবে সর্বোত্তম গুণাবলীর অধিকারী হবে। এ-জন্য তাকে নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে। যে স্থানে যেমন আচরণ মার্জনীয় ও উপযুক্ত সে স্থানে তেমন আচরণই করবে। স্বাভাবিকভাবে প্রথমে ন¤্রতা ও ভদ্রতা অবলম্বন করবে এরপর প্রয়োজনে কঠোরতা ও রূঢ়তা প্রদর্শন করা যেতে পারে। প্রথমে ধৈর্য, ক্ষমা ও উদারতা প্রকাশ করতে হবে এরপর শক্তি ও ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
أَشِدَّاءُ عَلٰى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও এবং তার সাহাবাগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর, পরস্পর করুণা ও দয়াশীল। [সুরা মুহাম্মাদ, আয়াত ২৯]
৮) দাওয়াহ‘র কাজে আধুনিক পদ্ধতি ও উন্নত মাধ্যম ব্যবহার করা : হিকমতের আওতাভুক্ত আরও একটি বিষয় হলো, দা‘ই ব্যক্তি দাওয়াহ’র ক্ষেত্রে আধুনিক ক্ষেত্র ও মাধ্যমসমূহ ব্যবহার করবে। তা যেখান থেকেই আসুক বা যেখানেই তৈরি হোক। আর তা হবে আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া স্বরূপ, যিনি তার জন্য এসব সরঞ্জামের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

দ্বিতীয় পদ্ধতি
সদুপদেশ
সংজ্ঞা
সদুপদেশ (نصیحت) উত্তম ভাষায়, সুন্দর পদ্ধতিতে নসিহত পেশ করা।
দৃশ্যপট
১) ন¤্র, বিনীত এবং সুস্পষ্ট ভাষায় কথা বলা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَقُولُوْا لِلنَّاسِ حُسْنًا
আর তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তমরূপে কথা বলো। [সুরা বাকারা, আয়াত ৮৩]
২) প্রয়োজনে ইশারা ইঙ্গিত ব্যবহার করা। পাশ কেটে কথা বলা। তাওরিয়া ব্যবহার করা। (তাওরিয়া বলা হয়, শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে এমন কথা বলা যার দ্বারা দূরবর্তী কোনো অর্থ উদ্দেশ্য করা হয়)
৩) উপদেশমূলক ঘটনা ও কাহিনী উপস্থাপন করা, মোহনীয় ভাষায় বয়ান করা।
৪) ভালো ও উত্তম বিষয়ের প্রশংসা প্রকাশ করা এবং মন্দ ও গর্হিত বিষয় সম্পর্কে নিন্দা জ্ঞাপন করা।
৫) সৎ কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধকরণ এবং অসৎ কাজ থেকে ভীতি প্রদর্শন করণ।
৬) বিজয় ও কর্তৃত্বের অঙ্গিকার প্রদান করা। তৎসঙ্গে ছবর ও ধৈর্যের প্রশিক্ষণ প্রদান করা।
এছাড়াও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্যন্য দিকসমূহ অবলম্বন করা, যা মাদ‘উর ওপর প্রভাব বিস্তার করে এবং তাকে আনুগত্য করতে এবং দা‘ইর দাওয়াহ মেনে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। উদাহরণ স্বরূপ আমরা ওই গ্রাম্য ব্যক্তিটির ঘটনা উল্লেখ করতে পারি। যে মসজিদে নববির ভেতরে পেশাব করছিল। সাহাবায়ে কেরাম তাকে এ অবস্থায় দেখামাত্র ধমকানো আরম্ভ করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের থামার জন্য ইশারা করলেন এবং বললেন, ‘তোমরা তার প্রস্রাব বন্ধ করে দিয়ো না, তাকে প্রস্রাব করতে দাও। সাহাবায়ে কেরাম আর কিছু বললেন না। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাছে ডাকলেন এবং বুঝালেন, দেখ- ‘নিশ্চয় এই সব মসজিদে প্রস্রাব-পায়খানা কিংবা এ ধরনের (নি¤œমানের) কার্য সম্পাদন করা সমিচীন নয়। এই সব জায়গা তো শুধু মাত্র আল্লাহ তায়ালার যিকির, ইবাদত, নামায ও কুরআন তেলাওয়াতের জন্য। [বুখারি ও মুসলিম]

তৃতীয় পদ্ধতি
উত্তম পন্থায় বিতর্ক
বিতর্কের সংজ্ঞা
প্রতিপক্ষের দাবি ও যুক্তির অসাড়তাকে দলিল বা সংশয় দ্বারা প্রতিহত করা।
বিতর্কের প্রকারভেদ
বিতর্কের ফল কখনো ভালো হয় আবার কখনো মন্দও হয়। তাই ওলামায়ে কেরাম একে দুইভাগে বিভক্ত করেছেন। ক) প্রশংসনীয় বিতর্ক খ) নিন্দনীয় বিতর্ক। অবশ্য এই বিভক্তিকরণ বিতর্ককারীর উদ্দেশ্য, পদ্ধতি ও বিতর্কের ফলাফল প্রভৃতির দিক বিবেচনা করে করা হয়েছে।
সুতরাং যে বিতর্ক কোনো সত্যকে প্রতিষ্ঠা অথবা তাকে সাহায্যের উদ্দেশ্য করা হয় আর তা হয় সঠিক পদ্ধতিতে, যার ফলাফলও হবে ভালো এবং উপকারী তবে সেই বিতর্ককে বলে প্রশংসনীয় বিতর্ক। এছাড়া যদি নিয়মবহির্ভূত অন্য কোনোভাবে বিতর্ক সংঘটিত হয় তবে সেটা হবে নিন্দনীয় বিতর্ক। এ-সব বিষয়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েই পবিত্র কুরআনে শুধুমাত্র উত্তম এবং প্রশংসনীয় বিতর্কের অনুমতি দিয়েছে।
কখন বিতর্কে যাবে?
বিতর্ক বা বাহাছ-মুবাহাছা শুধু তার সঙ্গেই করা যেতে পারে যার সঙ্গে বিতর্ক করলে উপকার হবে। কিন্তু যে ব্যক্তি ভালো কথা শোনে ও মানে তার সঙ্গে বিতর্কের প্রয়োজন হয় না। তার পরেও বিতর্কে জড়িয়ে পড়া মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম। সৃষ্টিগত ভাবেই মানুষ বিতর্কপ্রিয়। তাই সবাই বিতর্ক করে, ভালো মানুষ, খারাপ মানুষ, ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সবার থেকেই বিতর্ক প্রকাশ পায়।
আল্লাহ বলেন,
وَكَانَ الْإِنْسَانُ أَكْثَرَ شَيْءٍ جَدَلًا۞
অর্থ : মানুষই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি কলহপ্রবণ। [সুরা কাহাফ, আয়াত ৫৬]
নবি আলাইহিমুস সালামও কখনো কখনো বিতর্ক পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন,
قَالُوا يَا نُوحُ قَدْ جَادَلْتَنَا فَأَكْثَرْتَ جِدَالَنَا۞
অর্থ : তারা বললো, হে নুহ! তুমি আমাদের সঙ্গে বিতর্ক করছো। আর তা খুব বেশিই করছো। [সুরা হুদ, আয়াত ৩২]
সাহাবিদের যুগ থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত অনেক দা‘ই এ পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব আরোপ করে এসেছেন। এ ব্যাপারে তাদের নিন্দার কথাও বর্ণিত রয়েছে। তবে তাদের থেকে বিতর্কের নিন্দা সম্পর্কীয় যে কথা রয়েছে তা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, ‘নিন্দনীয় বিতর্ক’ বা কুরআন অথবা তার আয়াত নিয়ে বিতর্ক।
বিতর্কের আদব
ওলামায়ে কেরাম বিতর্কের ক্ষেত্রে যেসব আদব উল্লেখ করেছেন, তা তিনটি বিষয়কে বাস্তবায়ন করার মাঝে সীমাবদ্ধ। তা হলো,
১) বিতর্ক থেকে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সংশোধন করা।
২) পদ্ধতি ও প্রকৃতি বিশুদ্ধ করা।
৩) ফলাফল বিশুদ্ধ করা ও এর বিরূপ প্রভাব থেকে নিরাপদ হওয়া।

বিতর্ক পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য
১) বিতর্কে অবতীর্ণ হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজের বা নিজেদের ইলম ও যোগ্যতার ওপর যথেষ্ট পরিমাণ আস্থা থাকা। অজ্ঞতা এবং সংশয় নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হওয়া কোনো ভাবেই সমিচীন নয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تُحَاجُّوْنَ فِي إِبْرَاهِيمَ وَمَا أُنْزِلَتِ التَّوْرَاةُ وَالْإِنْجِيلُ إِلَّا مِنْ بَعْدِهِ أَفَلَا تَعْقِلُونَ ۞هَا أَنْتُمْ هَؤُلَاءِ حَاجَجْتُمْ فِيمَا لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ فَلِمَ تُحَاجُّونَ فِيمَا لَيْسَ لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ۞
অর্থ : হে আহলে কিতাবগণ! কেন তোমরা ইবরাহিমের ব্যাপারে বাদানুবাদ করো? অতপর তাওরাত ও ইনযিল তার পরেই নাযিল হয়েছে। তোমরা কি তা বুঝ না? তোমরা তো সেই লোক যারা নিজেদের জানা বিষয়ের ওপর বিবাদ করতো। এখন আবার সে বিষয়ে কেন বিবাদ করছো যে বিষয়ে তোমাদের কোনো জ্ঞানই নেই। আর আল্লাহ সবিশেষ অবগত রয়েছেন। তোমরা অবগত নও। [সুরা ইমরান, আয়াত ৫৬-৬৬]
২) প্রতি পক্ষের বিরুদ্ধে দলিল কায়েম করা এবং তাদেরকে লাজাওয়াব করা। সুতরাং বিতর্ককারীর জন্য কোনো দলিল ছেড়ে দেওয়া বা কোনো সংশয়কে তুচ্ছ মনে করা যাবে না, যা সে আঁকড়ে নিজের সত্যতার পক্ষে অবস্থান নিতে পারে অথবা নিজের দাবির পক্ষে দলিল পেশ করতে পারে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِيْ حَاجَّ إِبْرَاهِيْمَ فِيْ رَبِّه أَنْ آَتَاهُ اللهُ الْمُلْكَ إِذْ قَالَ إِبْرَاهِيْمُ رَبِّيْ اَلَّذِي يُحْيِيْ وَيُمِيْتُ قَالَ أَنَا أُحْيِيْ وَأُمِيْتُ قَالَ إِبْرَاهِيْمُ فَإِنَّ اللهَ يَأْتِيْ بِالشَّمْسِ مِنَ الْمَشْرِقِ فَأْتِ بِهَا مِنَ الْمَغْرِبِ فَبُهِتَ الَّذِيْ كَفَرَ وَاللهُ لَا يَهْدِيْ الْقَوْمَ الظَّالِمِيْنَ۞
আপনি কি সেই লোককে দেখেননি যে প্রতিপালক সম্পর্কে ইবরাহিমের সঙ্গে বিতর্ক করেছিল এই কারণে যে, আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে রাজত্ব দান করেছিলেন। যখন ইবরাহিম বললেন, যিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান তিনিই আমার পালনকর্তা। সে বললো, আমিও জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটিয়ে থাকি। ইবরাহিম বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ সূর্য পূর্ব দিক থেকে উদিত করে থাকেন, এবার তুমি তা পশ্চিম দিক হতে উদিত করো দেখি! তখন কাফের হতভম্ব হয়ে গেল। বস্তুত আল্লাহ তায়ালা সীমালঙ্ঘনকারী জাতিকে পথের সন্ধান দেন না। [সুরা বাকারা, ২৫৮]
৩) বিতর্কে যাওয়ার কারণসমূহের বিভিন্নতা প্রকাশ করা। যেমন-
ক) মানসিক কারণ : যেমন নির্দিষ্ট কোনো মতের ওপর দৃঢ়ভাবে আত্মতৃপ্তি লাভ করা বা কোনো বিষয়ের সমাধান দ্রুতগতিতে হওয়ার মানসিকতা প্রকাশ করা কিংবা কোনো কাজে আশ্চর্য হওয়া ইত্যাদি। যেমন আদম আলাইহিস সালামের সৃষ্টির ব্যাপারে আল্লাহর সঙ্গে ফেরেশতাদের মতানৈক্য হওয়ার ব্যাপরটি। আবার তাওহিদের প্রতি মুশরিকদের আত্মপ্রকাশ। কখনও কখনও বিতর্কের ক্ষেত্রে মানসিক কারণ অহংকার কিংবা হিংসাও হতে পারে। যেমনটা ইবলিসের ক্ষেত্রে হয়েছিল। অথবা কারণটা হক কিংবা হকপন্থীদের সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রুপও হতে পারে। অথবা কোনো বিষয়ে কঠিন ভয় কিংবা অপছন্দও এক্ষেত্রে কারণ হতে পারে। যেমন বদর দিবসে মুমিনদের ক্ষেত্রে হয়েছিল।
খ) বিদ্যা সম্পর্কিত কারণ : যেমন, কোনো বিষয়ে অজ্ঞতার কারণে প্রশ্ন করা বা সে বিষয়ে উপকার লাভের চেষ্ট করা। অথবা কোনো দলিল বা দুটি দলিলের মাঝে প্রাধান্য নিয়ে বিতর্ক করা। অথবা কোনো বিষয়ের সন্দেহ-সংশয় দূর করা।
গ) সামাজিক কারণ : যেমন কোনো কথা বা মত কিংবা মাযহামের পক্ষাবলম্বন করে গোঁড়ামি করা। অথবা পূর্বপুরুষদের রীতি- রেওয়াজকে অন্ধের জষ্টির মতো আঁকড়ে ধরা।
তাই একজন দা‘ইর জন্য আবশ্যক যে, প্রতিপক্ষ কেন বিতর্কে লিপ্ত হলো, তার মূল কারণ উদ্ঘাটন করা। যেন সে তার সঙ্গে কীরূপ ব্যবহার করবে অথবা কিভাবে বিতর্কের মোটিভ নির্ধারণ করবে তার ধারণা গ্রহণ করতে পারে। ইতোপূর্বে আমরা দাওয়াহ’র ক্ষেত্রে হিকমত পদ্ধতির আলোচনায় বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করেছি।
কুরআন ও সুন্নাহে বিতর্কের উদাহরণ ভরপুর। চাই সেটা মুমিনদের পারস্পরিক বিতর্ক হোক অথবা কাফিরদের সঙ্গে তাদের বিতর্ক হোক। সুতরাং দা‘ইর ওপর আবশ্যক হলো, সে বিষয়গুলো আয়ত্ব করা এবং সেখান থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করা।

চতুর্থ পদ্ধতি
উত্তম আদর্শ
উত্তম আদর্শের সংজ্ঞা
উত্তম আদর্শ এমন দৃষ্টান্তের নাম যা দেখে অন্যরা তার সাদৃশ্য অবলম্বন করবে এবং তার অনুরূপ আমল করবে।
এখানে আদর্শকে উত্তমতার সঙ্গে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। কারণ আদর্শ দুই প্রকার। উত্তম আদর্শ, খারাপ আদর্শ। যেন খারাপ আদর্শ এখান থেকে বের হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَنْ سَنَّ فِیْ الْاِسْلَامِ سُنَّۃً حَسَنَۃً، فَلَہ اَجْرُھا وَاَجْرُھَا اَجْرُمَنْ عَمِلَ بِھَا مِنْ بَعْدِہ مِنْ غَیْرِ اَنْ یَّنْقُصَ مِنْ اُجُوْرِھِمْ ، وَمَنْ سَنَّ فِیْ الْاِسْلَامِ سُنَّۃً سَیِّئَۃً ، کَانَ عَلَیْہِ وَزَرَھَا وَ وَزَرَ مَنْ عَمِلَ بِھَا مِنْ بَعْدِہ مِنْ غَیْرِ اَنْ یَّنْقَصَّ مِنْ اَوْزَارِھِمْ شَیْئٌ (رواہ مسلم)
অর্থ : যে ব্যাক্তি ইসলামে উত্তম রীতি প্রবর্তন করবে, সে তার প্রতিদান পাবে এবং সে অনুযায়ী যে আমল করবে তার প্রতিদানও সে লাভ করবে। অথচ তাদের (অনুসারীদের) প্রতিদানে সামান্য পরিমাণও কম করা হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো খারাপ প্রথা চালু করবে তার পাপের বোঝা তার ওপর বর্তাবে এবং সে অনুযায়ী যারা আমল করবে তাদের পাপও। অথচ তাদের (অনুসারীদের) পাপের অংশ থেকে কোনো অংশ কম করা হবে না। [মুসলিম, নাসায়ী, তিরমিযি, ইবনু মাজাহ]

উত্তম আদর্শের প্রকারভেদ
উত্তম আদর্শ দুই ভাগে বিভক্ত
১) সার্বিক ও ব্যাপক উত্তম আদর্শ : এমন আদর্শ যা সবধরনের ত্রুটি থেকে মুক্ত, মাসুম। যেমন নবি ও রাসুল আলাইহিমুস-সালামের আদর্শ। আল্লাহ বলেন,
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِيْ رَسُوْلِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ ۞
অর্থ : নিশ্চয় আল্লাহর রাসুলের মাঝে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। [সুরা আহযাব, আয়াত ২১]
২) নির্দিষ্ট পরিমাণের উত্তম আদর্শ : অর্থাৎ যে আদর্শ ত্রুটিমুক্ত নয়। যেমন সৎলোকের অবস্থা। তাদেরকে কোনো বিষয়ে আদর্শরূপে গ্রহণ করা যাবে, সব বিষয়ে নয়। কেননা তাদেরও ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকে। তারা ভুলত্রুটির উর্ধ্বে নয়।
উত্তম আদর্শের গুরুত্ব
১) আদর্শের প্রভাব ব্যাপক। মানবিক জীবনের সকল পর্যায়ের এর সমান গুরুত্ব বিদ্যমান। এমনকি অজ্ঞ লোকদের জন্য প্রয়োজন তার একটি আদর্শিক মনোভাব এবং জৈবিক সমস্ত উপায়-উপকরণ কোনো উত্তম আদর্শ থেকে গ্রহণ করা। কারণ অনুসরণের ক্ষেত্রে দাওয়াহ’র এই উপকরণটি গ্রহণ করা সবার জন্য সহজ ও সম্ভব। বিধায় একজন অজ্ঞ ব্যক্তি না বুঝেও অন্যকে অনুসরণ করতে পারে।
২) স্বভাবগত ভাবে মানুষ পড়ে বা শোনে যতটুকু প্রভাবিত হয় তার চেয়ে আদর্শের মাধ্যমে বেশি প্রভাবিত হয়। বিশেষত বাস্তবসম্মত বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে।
৩) নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা নবি ও রাসুলদের তার বান্দাদের জন্য বাস্তব নমুনা স্বরূপ প্রেরণ করেছেন, শুধু রাসুল প্রেরণ করে এবং কিতাব নাযিল করেই ক্ষ্যান্ত হননি। তিনি ইরশাদ করেন,
أُولٰئِكَ الَّذِيْنَ هَدَى اللهُ فَبِهُدَاهُمُ اقْتَدِهِ۞
ওরা সেই ব্যক্তি যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা পথ প্রদর্শন করেছেন। অতএব তুমিও তাদের পথের অনুসরণ করো। [সুরা আনআম, আয়াত ৯০]
উত্তম আদর্শের বৈশিষ্ট্য
১) অনুসৃত ব্যক্তি থেকে অনুসরণকারীর প্রতি কল্যাণ দ্রুত ও সহজে পৌছে যায়।
২) নিরাপদ গ্রহণ এবং বিশুদ্ধতার প্রতিশ্রুতি। বিশেষত বাস্তব ও সূক্ষè বিষয়গুলোতে এ পদ্ধতির বিশেষ ফায়দা অনেক।
এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতকে ইসলামের কতিপয় রুকনের ক্ষেত্রে দৃঢ়ভাবে শিক্ষা নেওয়ার জন্য আদেশ করেছেন। যেমন সালাত এবং হজের ক্ষেত্রে তাকে সূক্ষèভাবে অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সালাতের ক্ষেত্রে তিনি বলেছেন,
صَلُّوْا کَمَارَأَیْتُمُوْنِیْ اُصَلِّیْ (رواہ البخاری)
অর্থ : তোমরা আমাকে যেভাবে সালাত আদায় করতে দেখ, ঠিক সেভাবে (তোমরা নিজেরা) আদায় কর। [বুখারি]
হজের ক্ষেত্রে তিনি বলেছেন,
خُذُوْا عَنِّیْ مَنَاسِکَکُمْ (رواہ البخاری و مسلم)
অর্থ : তোমরা আমার কাছ থেকে তোমাদের হজের পদ্ধতি শিখে নাও। [বুখারি, মুসলিম, নাসায়ি]
৩) এই পদ্ধতির দাওয়াহ পন্থা মানুষের অন্তরে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে। বাস্তবসম্মত বিষয়গুলোতে দ্রুত সাড়া পাওয়া যায়। এই বাস্তব ধারণা থেকেই হযরত উম্মে সালমা রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হুদাইবিয়ার দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইঙ্গিত করেছিলেন, তিনি যেন আগেই মাথা মু-ন করে নেন এবং হালাল হয়ে যান। তার এ আমল দেখে সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত মুসলমান মাথা মু-ন করে হালাল হয়ে গেলেন। [বুখারি]
অনুরূপ মক্কা বিজয়ের দিনেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি দুধ বা পানিভর্তি পাত্র আনিয়ে নিলেন। তারপর সবার সামনে পান করলেন এবং রোযা ভেঙ্গে ফেললেন। তার এই দৃশ্য দেখে সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত মুসলমান রোযা ভেঙ্গে ফেলেন। [বুখারি]

প্রথম প্রবন্ধ
দাওয়াতের সমসাময়িক পথ ও পদ্ধতি
যুগে যুগে আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য নবি ও রাসুলের মাধ্যমে আমাদের কাছে হেদায়েতের মহান বাণী সহ পাঠিয়েছেন। তারা ছিলেন আমাদের মানবজাতির শ্রেষ্ঠ মানুষ। রাসুলদের মধ্যে সর্বশেষ রাসুল মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল। আমরা তার উম্মত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত বলে ঘোষণা করেছেন। এরশাদ হচ্ছে,
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَوْ آَمَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ مِنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُونَ
‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।’ (সুরা ইমরান : ১১০)
মোট কথা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার কাছে মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভর করে দাওয়াতের কাজে অংশগ্রহণের উপর। দাওয়াতের কাজে যে যত অংশগ্রহণ করতে পারবে সে তত বেশি গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদার অধিকারী হবে। আর এই ধারাবাহিকতা কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ।
আধুনিক যুগে দাওয়াতি কাজ করতে হলে একজন দাঈ বা ইসলাম প্রচারককে যুগোপযোগী দাওয়াতি পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। আল্লাহ তায়ালা চান যেন যুগের চাহিদা অনুযায়ী সুকৌশলে মানুষকে তার পথে দাওয়াত দেওয়া হয়। এ জন্য তিনি নবী-রাসুলদের যুগ চ্যালেঞ্জসক্ষম জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন করে প্রেরণ করেছিলেন। আল্লাহ তায়ালা যখনই কোনো জাতির কাছে নবী পাঠিয়েছেন, তিনি তাঁকে তাদের যুগোপযোগী করে, তাদের ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছেন। যেন তাদের আচার-আচরণ, কথাবার্তা, সামাজিক প্রথা, ঐতিহ্য অনুধাবন ও মূল্যায়ন করে তাদের দ্বীনের প্রতি দাওয়াত দিতে সক্ষম হন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন,
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ
‘আমি প্রত্যেক পয়গম্বরকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদের পরিষ্কারভাবে বোঝাতে পারে।’ (সুরা ইবরাহিম : ৪)
মুখের ভাষার মতো রয়েছে অবস্থার ভাষা। সব নবী মুখের ভাষার মতো অবস্থার ভাষা সম্পর্কে ছিলেন পূর্ণ অবহিত। অবস্থার ভাষা যে জাতি বোঝে না তাদের উন্নতি অসম্ভব। এই যেমন যুগের চাহিদায় সাড়া দিয়ে প্রিয়জনের কাছে থাকতে আমরা ঠিকই মোবাইল ব্যবহার করছি, এর সুবিধা ভোগ করছি; এক্ষেত্রে কারও অনীহা নেই। তবে দাওয়াতি কাজে প্রযুক্তি বা ইন্টারনেট ব্যবহারে অনেকের রয়েছে যত আপত্তি। ইন্টারনেটে আপত্তিজনক অনেক কিছু থাকলেও এর ব্যবহারকারী বিপুল জনগোষ্ঠীকে দাওয়াতের আওতায় আনাটা কি এখন সময়ের দাবি নয়? অশ্লীলতার আবর্তে হারিয়ে যাওয়া জনগোষ্ঠীকে আপত্তিকর বিষয় থেকে উদ্ধারকল্পে একটি বিশেষ দাওয়াতি দলের প্রয়োজনীয়তা ও তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে কুরআনে হাকিমের দিকনির্দেশনা হলো,
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
‘আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত যারা আহ্বান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভালো কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম।’ (সুরা ইমরান : ১০৪)
দাওয়াত কখন কি পদ্ধতিতে হবে তাও পরিস্থিতির আলোকে হেকমত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। দাওয়াতের পদ্ধতি বা মাধ্যমকে যুগোপযোগী করাও ইসলামের একটি মূলনীতি। দাওয়াতের পদ্ধতি সম্পর্কে মহান আল্লাহর বাণী,
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
‘তুমি মানুষকে আপন প্রতিপালকের পথে ডাক, কৌশল ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে আলোচনা কর উত্তম পন্থায়।’ (সুরা নাহল : ১২৫)
এ জন্যই রাসুল (সা.) দাওয়াতের ক্ষেত্রে তাঁর যুগের সবচেয়ে আধুনিক পদ্ধতিগুলো বেছে নিয়েছিলেন। যেমন কোরাইশদের প্রথা ছিল গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংবাদ দিতে উলঙ্গ হয়ে সাফা পাহাড়ে উঠে চিৎকার করা। যাকে বলা হত ‘নাযিরুল উরইয়ান’ বা হতবিহ্বল ভীতি-প্রদর্শনকারী। রাসুল (সা.)ও এই পদ্ধতিতে লোকজনকে সাফা পাহাড়ের পাদদেশে জড়ো করে দাওয়াতের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তবে তিনি জাহেলি যুগের প্রথানুসারে বিবস্ত্র হননি। এতে প্রমাণিত হয় যে, তিনি ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে উক্ত প্রচার ব্যবস্থাটিকে পরিমার্জিত ও উন্নত করেছিলেন।
এছাড়া পশুর চামড়ায় লিখিত ঈমানের দাওয়াত সংবলিত চিঠি প্রেরণ করেছেন সমসাময়িক অনেক রাজা-বাদশাহর উদ্দেশে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে তার ব্যক্তিগত প্রতিনিধিদের পাঠিয়ে চালিয়েছেন কূটনৈতিক তৎপরতা। তিনি তার যুগের সব আধুনিক পদ্ধতির যথাযথ ব্যবহার করে আমাদের সামনে স্থাপন করে গেছেন দাওয়াতের কৌশল ও আদর্শ। যা সব যুগের ইসলাম প্রচারকদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ।
এ জন্য একজন দাঈকে ইসলামী জ্ঞানের পাশাপাশি প্রযুক্তির জ্ঞানেও পারদর্শী হতে হবে। আর ইসলামের দাওয়াত দিতে হবে বিজ্ঞানসম্মতভাবে ও শৈল্পিক উপস্থাপনায়, যাতে মানুষ ইসলামি জীবন ব্যবস্থার দিকে আকৃষ্ট হয়। বর্তমান পৃথিবীর কোনো মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে পরিবার-পরিজন ছেড়ে নিরুদ্দেশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নেই পশুর চামড়া বা গাছের পাতায় কিছু লিখে পাঠানোরও। বরং হাতের স্মার্টফোন, নোটপেড, ল্যাপটপ বা কম্পিউটারই এখন ইসলাম প্রচারের যুগোপযোগী মাধ্যম হতে পারে। ইন্টারনেটের কল্যাণে ফেসবুক, টুইটার, ব্লগ, ইউটিউব, ই-মেইলের সহযোগিতায় পৌঁছা যায় অনেক দূরের মানুষটির কাছেও। সংক্ষিপ্ত, গোছালো, মার্জিত ও দরদি একটি লেখা, একটি স্টেটাস, ইউটিউবে আপলোড করা একটি বয়ান, মেইলে পাঠানো একটি বার্তাই পৃথিবীর যে কোনো দেশের যে কাউকে দিতে পারে আলোকিত জীবনের সন্ধান। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, ব্লগ, ইউটিউব প্রভৃতিকে ইসলাম প্রচারের মাধ্যমে পরিণত করে মুসলিমদের একটি দক্ষ জনবলকে অগ্রণি ভূমিকা পালন করা উচিত। কারণ মানুষ পৃথিবীতে যত কাজে সময় ব্যয় করে দাওয়াতের কাজে ব্যয়িত সময়গুলোই তার মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন,
قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ۞
অর্থ : বলুন এটাই আমার পথ। আমি জেনে বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও। আর আল্লাহ পবিত্র মহান এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। [সুরা ইউসুফ, আয়াত ১০৮]
যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দাওয়াতের মতো ইসলামের একটি অপরিহার্য বিধানকে নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখা সময়ের দাবি নয়। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার এ যুগে ইসলাম প্রচারে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব নয়। একমাত্র প্রযুক্তির মাধ্যমেই সম্ভব ইসলামের সুমহান বাণীকে পৃথিবীর সব দেশের সব মানুষের কাছে দ্রুততম সময়ে পৌঁছে দেওয়া। তেমনি সম্ভব ইসলামবিরোধীদের সব অপপ্রচার ও অপবাদের জবাব দেওয়া।

ইন্টারনেটে দাওয়াহ প্রেক্ষাপট ও প্রয়োজনীয়তা
মানুষ যত কাজে সময় ব্যয় করে দাওয়াতের কাজে ব্যয়িত সময়গুলিই তার মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
﴿ وَمَنۡ أَحۡسَنُ قَوۡلٗا مِّمَّن دَعَآ إِلَى ٱللَّهِ وَعَمِلَ صَٰلِحٗا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ ٱلۡمُسۡلِمِينَ﴾
‘আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম, যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, আবশ্যই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত। [সুরা হামিম সাজদাহ ৩৩]
﴿قُلْ هٰذِهۦ سَبِيلِيٓ أَدۡعُوٓاْ إِلَى اللّٰهِۚ عَلىٰ بَصِيْرَةٍ أَنَا۠ وَمَنِ اتَّبَعَنِيۖ وَسُبۡحٰنَ اللّٰهِ وَمَآ أَنَا۠ مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ﴾
‘বল, ‘এটা আমার পথ। আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও। আর আল্লাহ পবিত্র মহান এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।’ [সুরা ইউসুফ, আয়াত : ১০৮]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
فَوَاللَّهِ لأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِكَ رَجُلاً وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْرُ النَّعَمِ.
‘আল্লাহর শপথ, ‘তোমার মাধ্যমে একজনকে আল্লাহর হেদায়েত দান করা তোমার জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম।’ [বুখারী : ৪২১০; মুসলিম : ৬৩৭৬]
উল্লিখিত কুরআনের আয়াত ও হাদিসের আলোকে বলা যায়, প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য নবী-রাসুল, সমাজসংস্কারক ও আল্লাহর পথে একনিষ্ঠভাবে আহ্বানকারী পুণ্যবান ব্যক্তিদের পথ অনুসরণ করা। তাঁদের অনুবর্তিতায় দাওয়াতের কাজ করতে গিয়ে মনে রাখতে হবে, সমকালে মানুষের জীবনযাপনের ধরন বদলেছে। অভূতপূর্ব বিপ্লব সাধিত হয়েছে প্রযুক্তির সকল শাখায়। ফলে মানুষের ওপর সরাসরি ছাপ রাখার পদ্ধতিও বদলেছে। বিশ্বজুড়ে ভিন্নতা এসেছে দাওয়াত ও প্রচার কৌশলে। আগে সমাজ সংস্কারকগণ বাজারে, মসজিদে ও বিভিন্ন লোক সমাগমস্থলে গিয়ে মানুষকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিতেন। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির এই উৎকর্ষের যুগে একজন দা‘ই (আল্লাহর পথে আহ্বানকারী) ঘরে বসেই রেডিও, টিভি, সিডি, বই ও পত্র-পত্রিকা ইত্যাদির মাধ্যমে দাওয়াত পৌঁছাতে পারেন কোটি কোটি লোকের দুয়ারে। এটিকে সহজ ও গতিশীল করেছে আন্তর্জাতিক তথ্যবিনিময় মাধ্যম তথা ‘ইন্টারনেট’। সন্দেহ নেই আল্লাহর দিকে মানুষকে ডাকার এক চমৎকার মাধ্যম এই ইন্টারনেট। কারণ-
১. ইন্টারনেটের প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন বেড়েই চলেছে
এ যুগে যে কোনো তথ্যের জন্য মানুষ ইন্টারনেটের শরণাপন্ন হচ্ছে। বহির্বিশ্বের সকল ছাত্র-ছাত্রী প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য ছুটে আসে ইন্টারনেটের দুয়ারে। আগে পৃথিবীর অনেক দেশেই ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ও বিস্তারিত কোনো তথ্য পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হত। বর্তমানে এ অবস্থায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। এখন মানুষ বাড়িতে বসে এমনকি নিজের খাস কামরায় শুয়েও অনায়াসে ইসলাম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পারছে। আর মোবাইলে নেট সার্ভিস যোগ হওয়ায় তথ্য চলে এসেছে প্রযুক্তি সচেতন মানুষের হাতের মুঠোয়।
২. স্বল্প খরচের দাওয়াতি মাধ্যম
কেউ যদি মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছানোর উদ্দেশে একটি ছোট গ্রন্থও প্রকাশ করতে চান, এজন্য তাকে কমপক্ষে কয়েক হাজার টাকা খরচ করতে হবে। পক্ষান্তরে এ ব্যক্তি যদি বইটি ইন্টারনেটে প্রকাশ করেন, এর জন্য তাকে উল্লেখযোগ্য কোনো এমাউন্ট ব্যয় করতে হবে না। অনেক কোম্পানি আছে যাদের সেবা নিতে কোনো খরচই গুনতে হয় না। আল্লাহর পথে আহ্বানকারীরা এই সুযোগের সৎ ব্যবহার করতে পারেন।
৩. এই মাধ্যমে কাজ করা অনেক সহজ
ইন্টারনেটের মাধ্যমে দাওয়াত দেওয়া এবং এর পদ্ধতি রপ্ত করা একেবারে সহজ। এর জন্য কোনো সার্টিফিকেট লাভ বা কঠিন প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না। অনেক ইসলাম প্রচারক আছেন, যারা মাত্র ক’দিনে ইন্টারনেটে নিজস্ব পেইজ খোলা এবং অন্যের সঙ্গে তথ্য ও বাক্যের আদান-প্রদানের পদ্ধতি শিখেছেন। আজ এদের থেকে অনেকেই উপকৃত হচ্ছেন।
৪. একটি বাড়তি সুবিধা
যেমন ধরুন আপনি ঘুমিয়ে আছেন, সফরে আছেন কিংবা আপনি এখন ব্যস্ত এ সময়েও কিন্তু আপনার দাওয়াতি সাইট বা আপনার সরবরাহকৃত তথ্য থেকে মানুষ উপকৃত হতে পারে। কিন্তু যিনি মসজিদের আসরে বা মাদরাসার শ্রেণিকক্ষে এলেম বিতরণ করেন, তিনি অসুস্থ হলে বা সফরে গেলে তার এলেম থেকে মানুষ তখন উপকৃত হতে পারে না। আবার দেখুন যখন কেউ আপনার কাছে ক্লাসে বা আসরে সরাসরি ইসলামের কোনো বিধান জানতে চাইবে, আপনি সে বিষয়ে না জানলে তাৎক্ষণিকভাবে আপনাকে অজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। অথচ ইন্টারনেটে যদি কেউ আপনার কাছে কিছু জানতে চায়, আপনি তার জবাব দেওয়ার জন্য বই দেখা বা অভিজ্ঞ কোনো আলেমের শরণাপন্ন হবার যথেষ্ট সুযোগ পাবেন।
৫. ব্যাপকভাবে কাজ করার সুবিধা ও অধিক প্রয়োজনীয়তা
দুঃখের সঙ্গে জানাতে হয়, অঙ্গনটিকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে দুনিয়াবাসী আমাদেরকে অনেক অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে। এমনকি এখনো এটিকে কাজে লাগানোর জন্য আমাদেরকে তাদের পদ্ধতি এবং তাদের কোম্পানিগুলোর ওপরই নির্ভর করতে হয়। ব্যাপারটি একেবারে স্বতঃসিদ্ধ। বিষয়টি স্বতন্ত্র আলোচনার দাবি রাখে। আগামী প্রবন্ধে আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো ইনশা আল্লাহ।

দ্বিতীয় প্রবন্ধ
ইন্টারনেটে দাওয়াতি প্রক্রিয়া
ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষের কাছে দীনের দাওয়াত পৌঁছানো যায় নানা উপায়ে। ইন্টারনেটে নিত্য নতুন সুবিধা যোগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর উপায়ও বাড়ছে প্রতিদিন। যেমন মেইল বা বার্তা আদান-প্রদানের সুবিধা যুক্ত হয়েছে ইন্টারনেট আবিষ্কারের পরে। আজ এটি মানুষকে হেদায়াতের দিকে আহ্বান এবং তাদের সামনে ইসলাম তুলে ধরার কার্যকরী মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এভাবে অনেক সেবাই ইদানিং সংযোজিত হয়েছে, যা আমরা দীন প্রচারে কাজে লাগাতে পারি। নিচে আপনাদের সামনে আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকার কিছু কার্যকর পদ্ধতি তুলে ধরছি :
আল্লাহর পথে ডাকার জন্য একটি ওয়েব সাইট তৈরি করুন
এটি ইন্টারনেটের মাধ্যমে দাওয়াতের সবচে ফলপ্রসূ ও অধিক কার্যকর উপায়। সাইটের মাধ্যমে প্রবন্ধ-নিবন্ধ, বই-পুস্তক ও পত্র-পত্রিকা সারা বিশ্বের কোটি কোটি পাঠকের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়া যায়। মুসলিম ও অমুসলিম সবাই এ থেকে উপকৃত হতে পারে। ইসলামী যে কোনো জিজ্ঞাসার জবাব প্রদানের মাধ্যমেও দীনের বিশাল খেদমত আঞ্জাম দেওয়া সম্ভব একটি সাইটের মাধ্যমে। সৌদি আরবের একটি ওয়েব সাইট রংষধসযড়ঁংব.পড়স এর কথাই বলি। বিশ্বের প্রায় আশিটি ভাষায় এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সারা বিশ্বে বাংলায় এর প্রায় ৯০ লাখ ব্রাউজার রয়েছে। আল-সুন্নাহ নামের (িি.িধষংংঁহহধয.পড়স/) একটি ইসলামী সাইটের পরিচালনা বোর্ডের বক্তব্য এমন : ‘আমরা এ সাইটে ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী অনেক অমুসলিমের চিঠি পাই। তারা জানতে চান কীভাবে ইসলামে দাখিল হতে হয়, এর পদক্ষেপগুলো কী কী ইত্যাদি। তেমনি দীনি জিজ্ঞাসার জবাব ও জীবন ঘনিষ্ঠ সমস্যার সমাধান জানতে চান আগ্রহী মুসলিমরা। পর্যাপ্ত শরঈ জ্ঞান ও বিভিন্ন ভাষায় পারদর্শী একদল কল্যাণব্রতী নিষ্ঠাবান যুবকের মাধ্যমে এসব পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক সব ভাষায়ই আমরা এর কার্যক্রম পরিচালনা করছি।’
এই মাধ্যমটির গুরুত্ব এখানেও নিহিত যে, সাইটটি হতে পারে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের অতি সমৃদ্ধ এক বিশাল লাইব্রেরি, যা নানা ভাষায় কোটি কোটি মানুষ নিখরচায় পড়তে পারবে। পৃথিবীর যে কোনো দেশ থেকে যে কোনো সময় সেখানে প্রবেশ করা যাবে। কয়েকটি দৃষ্টান্তগুলো আমাদের পথ দেখাতে পারে। যেমন : একটি সাইটে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার হাদিস আপলোড করে দেওয়া হয়েছে। আরেকটি সাইটে পবিত্র কুরআনের অনুবাদ দেওয়া হয়েছে সাতটি ভাষায়। আরেক সাইটে সৌদি আরবের ‘উচ্চতর ফতোয়া বোর্ডে’র চার হাজার ফতোয়া তুলে ধরা হয়েছে। অপর এক সাইটে বিভিন্ন ভাষায় প্রাজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য আলিমদের নয়শত ইসলামী সিডি উপস্থাপন করা হয়েছে।
ইন্টারনেটে অনেক কোম্পানির সন্ধান পাওয়া যায় যারা ফ্রি ডোমেইন দিয়ে থাকে। এসবের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় সাইট িি.িযুঢ়বৎসধৎঃ.হবঃ/। এ ধরনের যে কোনো জনপ্রিয় সাইটে ঢুকে আপনিও নিজের নামে একটি সাইট খুলতে পারেন। একটি দাওয়াতি পেজ খোলার জন্য আগ্রহী ব্যক্তিকে শুধু শিখতে হবে ‘ফ্রন্ট পেজ’ অথবা ওয়ার্ড ২০০০ এ কীভাবে পেইজ ক্রিয়েট করতে হয়। জানতে হবে কীভাবে নিজের সাইটটিকে কম্পিউটার থেকে ইন্টানেটে ওঠাবেন। আর এগুলো খুব সহজ কাজ। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদী কোনো প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না।
উল্লেখ্য, উপরোক্ত সাইটটি বর্তমানে ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, বসনীয়, আলবেনি, মালয়, ইন্দোনেশি, ফিলিপাইনি ও ফিনল্যান্ডিয়ান ভাষায় পরিচালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে নতুন আরও ছয়টি ভাষা সংযোজনের কাজ চলছে। সেগুলো হলো, হিন্দি, বাংলা, সিংহলিজ, তেলেগু, মালায়ালম ও তামিল ভাষা।
অনলাইন চ্যাটের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকা
এটি একটি উত্তম উপায়। এর কার্যকারিতাও অনেক বেশি। শুধু এ তথ্য জানানোই যথেষ্ট হতে পারে যে, উল্লিখিত সাইটের একজন দা‘ইর হাতে অল্প সময়ে বিভিন্ন জাতি ধর্মের বিশজন নারী-পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করেছেন এই অনলাইন চ্যাটের মাধ্যমে। এই চ্যাট বা আড্ডা হতে পারে কয়েক পদ্ধতিতে :
ক. সরাসরি আলোচনা (উরৎবপঃ ফরধষড়মঁব) :
এটি সম্ভব গরৎপ প্রোগ্রাম (যঃঃঢ়://িি.িসরৎপ.পড়স/) বা ওঈছ কিংবা ইয়াহু মেসেঞ্জার, গুগলটক বা ফেসবুক ইত্যাদি প্রোগ্রামের সাহায্যে। দীনের পথে মানুষকে আহ্বানকারী ব্যক্তি এসবের সাহায্যে একটি নির্দিষ্ট সময়ে কিংবা ব্যক্তিগত বা বিশেষ ব্যবস্থায় চ্যাট করতে পারেন। বাংলা ভাষায় এ মাধ্যমটিকে দাওয়াতের কাজে লাগানোর ঘটনা বিরল হলেও বিশ্বের বহুল প্রচলিত ভাষা যেমন ইংরেজি ও আরবিতে এ পদ্ধতি অনেক সুফল বয়ে আনছে। কতজন যে এভাবে তাদের দীনি জ্ঞানের পিপাসা নিবারণ করেছেন আর কতজন যে মানুষকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। ভুরি ভুরি ঘটনার মধ্যে এখানে মাত্র একটি তুলে ধরা যাক :
‘আমি একটি চ্যাট রুমে ছিলাম। সেটি ছিল অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়ার বিশেষ রুম। রুমটিতে আমি একাই ছিলাম। কথা বলতে বলতে আমি বিরক্ত ও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। অন্য কেউ সেখানে আসা পর্যন্ত আমি নিজেকে উপকারী অন্য কাজে নিয়োজিত করলাম। ইতোমধ্যে চ্যাট রুমে একজন যুবক প্রবেশ করল। সে আমার সহযোগিতা চাইলো। বলাবাহুল্য, আমি তখন পর্দায় অনুপস্থিত। সঙ্গত কারণেই তার ডাকে সাড়া দেওয়া হয়নি। তিনিও তখন অন্যমনস্ক হলেন। কিছুক্ষণ পরেই আবার ফিরে এলেন। আবার সহযোগিতা চাইলেন এবং ফিরে গেলেন। ব্যাপার হলো, আমি যখন পর্দায় লক্ষ্য করলাম, লোকটির রিকোয়েস্ট ও অনুনয় দেখতে পেলাম। তবে তা সময় পেরিয়ে যাবার পর। সহজেই আমি তাকে অন্য চ্যাট রুমে খুঁজে বের করতে সক্ষম হলাম। আমি তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলাম। তাকে বললাম, দয়া করে বলুন। আপনি কি চান আমি আপনাকে সহযোগিতা করি? এতে তিনি অত্যাধিক খুশি হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি মুসলিম? উত্তর দিলাম, জী, আলহামদুলিল্লাহ। এতে তার খুশির মাত্রা বেড়ে গেল।
তিনি আমাকে বললেন, ‘আমি একজন আমেরিকান। বয়স আমার ৩৬ বছর। ধর্মতত্ত্ব বিভাগ থেকে আমি মাস্টার্স করেছি। চাইলেই আমি পাদ্রী হতে পারি। কিন্তু একটি বাস্তবতা আমার শান্তি কেড়ে নিল। যখনই আমি নিজ ধর্মের গভীরে যাই, আমার সন্দেহ বেড়ে যায়। আমার ভেতরে আমি গভীর বৈপরীত্য অনুভব করি। তখন আমি খৃস্টধর্ম ছাড়া অন্যান্য ধর্ম নিয়ে গবেষণা শুরু করলাম। এমন কোনো বহুল আচরিত ধর্ম বিশ্বাস বাদ রাখলাম না, যার সম্পর্কে জালনাম না বা যা নিয়ে কিছু পড়লাম না। এভাবেই আমি ইসলামকে পেয়ে গেলাম। ইসলাম সম্পর্কে অনেক পড়াশুনা করলাম। অনুবাদ পড়ে আমি কুরআনও খতম করলাম। অবশেষে আমি স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম যে এটিই আল্লাহ প্রদত্ত সত্য ধর্ম। এটিই ফিতরাত ও প্রকৃতির ধর্ম।’ ‘আমার আবেদন হলো, আপনাদের ধর্মে কি আমাকে গ্রহণ করবেন? আমি কিভাবে ইসলামে দাখিল হবো? ইসলাম গ্রহণে আমাকে কী কী পদক্ষেপ অবলম্বন করতে হবে? ’
সত্য কথা কী ভদ্রলোকের সঙ্গে আমি যখন কথা বলছিলাম রাত বাজে তখন ২টা। তন্দ্রার প্রভাবে আমি নিজের হাত দুটিও দেখতে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু যখন লোকটির এসব কথা পড়লাম। মুহূর্তেই আমার নিদ্রা ছুটে পালালো। আমি তাকে বললাম, আপনি সুস্বাগত হে আমার নতুন ভাই। আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন। ব্যাপারটি একেবারে সহজ। আপনার প্রথম প্রশ্ন ছিল আপনাকে আমরা গ্রহণ করব কি-না? এর জবাবে বলি, আমাদের ধর্মে এর সুস্পষ্ট জবাবই রয়েছে। সেটা হলো, ‘হাইয়াকাল্লাহ’ তথা স্বাগতম আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন। যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয় আল্লাহ তা‘আলা তার দিকে এক হাত অগ্রসর হন। আর আপনি জানতে চেয়েছেন কীভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে হয়। এর উত্তর হলো, আপনাকে এজন্য তেমন কিছু করতে হবে না; শুধু আমি যা লিখি তা নিজের মুখ ও মন থেকে আবৃত্তি করবেন। আমি কালেমায়ে শাহাদাত লিখলাম এবং ইংরেজিতে তার অর্থও লিখে দিলাম। এরপর একজন সদ্য ইসলামে দাখিল ব্যক্তির জন্য গোসল, মাথা মু-ানো এবং নাপাক লেগে থাকলে পোশাক পরিবর্তনসহ যা কিছুর দরকার হয় লিখলাম।
এসব শুনে ভদ্রলোক খুশিতে আটখানা হয়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে শাহাদাহ পাঠ ও ঈমানের ঘোষণা দিলেন। অতপর তিনি একটি ইসলামিক সেন্টারে গেলেন। সেন্টারের লোকেরা তাকে আরও অনেক কিছু শেখালেন। পরে তিনি আমাকে একটি পত্র লিখেন। তাতে তিনি নিজের নতুন নাম জানান ঈমান আসাদ। তারপর থেকে আমাদের মাঝে নিয়মিত মেইল বিনিময় হয়। আলহামদুলিল্লাহ এমন আরও ঘটনা আমার সঙ্গে এবং আমার অন্য দাঈ ভাইদের সঙ্গেও ঘটেছে।
খ. পরোক্ষ আলোচনা (ওহফরৎবপঃ ফরধষড়মঁব) : ইন্টারনেটের সাহায্যে অন্যের সঙ্গে পরোক্ষভাবে আলোচনার ভিন্ন ভিন্ন দুটি উপায় রয়েছে :
১. সংলাপ প্রাঙ্গণ বা গবংংধমব ইড়ধৎফং- এর সাহায্যে অন্যের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা জনপ্রিয় সব সার্চ ইঞ্জিনেই এ সেবা রয়েছে। যেমন : গুগল, ইয়াহু, এমএসএন, বিং, ডগ পাইল, আস্ক ডট কম ইত্যাদি। এসব সাইটে কোটি কোটি মানুষ দুনিয়া ও আখিরাত সম্পর্কে তাদের বিচিত্র ভাবনা বিনিময় করেন। গণমানুষের মধ্যে মিশে যেতে এবং নানা ধর্ম ও মতের মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকতে এ এক আদর্শ ময়দান। চাইলে এ লিংকে একটি মাত্র ক্লিক করে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। আপনিও পারেন আল্লাহর পথে দাঈ হয়ে যেতে।
:যঃঃঢ়://সবংংধমবং.ুধযড়ড়.পড়স/রহফবী.যঃসষ
২. নিউজ গ্রুপস- এর সাহায্যে অন্যের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা। এসব মূলত আনলিমিটেড স্পেসজুড়ে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা, সংলাপ ও বিতর্কের গ্রুপ। বিশেষত এখানে সব ধর্ম, চিন্তা ও মতবাদের লোকেরা সবিস্তারে ধর্মীয় দিক আলোচনার করতে পারেন। এ অঙ্গনে অসংখ্য দিশেহারা ও পথভ্রষ্ট লোক হিদায়াতের আলো নিয়ে মতবিনিময় করে। তেমনি অনেক অমুসলিম এখানে তাদের সব ধরনের কুৎসা ও কৌশল ব্যবহার করে আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলামের ওপর আক্রমণ চালায়। আলহামদুলিল্লাহ এখানে অনেক ভালো লোকও রয়েছেন যারা অঙ্গনটিকে কাজে লাগাতে অনেক কষ্ট স্বীকার করেন। তবে প্রয়োজনের তুলনায় তাদের সংখ্যা অনেক কম।
আল্লাহর দিকে মানুষকে ডাকার জন্য ই-মেইল ব্যবহার করা
অন্যান্য মাধ্যমের তুলনায় এটি পূর্ণাঙ্গ ও চমৎকার মাধ্যম। এটি দাঈ ও আল্লাহর পথে আহ্বানকারীদের জন্য টার্গেট জনগোষ্ঠীর পৌঁছার সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। এ মাধ্যমটি কাজে লাগানোর কয়েকটি পদ্ধতি রয়েছে :
১. প্রচলিত পন্থায় ই-মেইলের মাধ্যমে পত্রবিনিময় : টার্গেট মানুষদের কাছে পৌঁছানো, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ইসলাম সম্পর্কে তাদের প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা খুঁজে পেতে এ এক চমৎকার মাধ্যম। উপরে উল্লিখিত আল-সুন্নাহ সাইটের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণকারীদের অধিকাংশই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এ ই-মেইল পদ্ধতির সাহায্যে।
২. ইন্টারনেটে অনেক কোম্পানির সন্ধান পাওয়া যায় : এরা যুক্তিসঙ্গত মূল্যে মেইলিং সেবা দিয়ে থাকে। এসব কোম্পানির কাছে রয়েছে মেইল এড্রেসের বিশাল তালিকা। এদের কারো কারো রয়েছে পাঁচ/ছয় কোটি মেইল এড্রেস। এসব কোম্পানির সঙ্গে দাঈ ও মুবাল্লিগগণ নির্দিষ্ট এমাউন্টের বিনিময়ে চুক্তিতে পৌঁছতে পারবেন। চল্লিশ পঞ্চাশ ডলার দিয়ে আপনি পাঁচ মিলিয়ন এড্রেস পেতে পারেন। সদ্ব্যবহার করতে পারলে, ভালোমত কাজে লাগাতে পারলে, সুন্দর বাক্য ও সুবচন চালিয়ে যেতে পারলে এটি একটি উত্তম মাধ্যম। বিশেষত আলোচনার বিষয় বা ঝঁনলবপঃ হওয়া চাই চিত্তাকর্ষক। তবে দেখে নিতে হবে কোম্পানিটি এক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য কি-না যাতে তারা কোনো ভুল ঠিকানা সরবরাহ না করে।
৩. নিজেই একটি মেইলিং তালিকা প্রস্তুত করা : এটি হলো একজন দাঈ নিজেই একটি মেইলিং তালিকা প্রস্তুত করবেন যেখানে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষের মেইল এড্রেস থাকবে। তালিকাটা যত বড় হবে ততই ভালো। এ পদ্ধতিতে দাঈ ব্যক্তি টার্গেট জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তার ফলপ্রসূ চিঠি এবং উপকারী উপদেশ বিনিময় করবেন। এতে করে লোকেরা উপকৃত হবে। মৌসুম ও দিবস বিবেচনায় আলোচনার বিষয়বস্তু বিভিন্ন রকম হবে। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, সৌদি আরবের এক ভাই ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি তালিকা অতি সম্প্রতি একটি মেইলিং তালিকা করেছেন যাতে দশ হাজারের অধিক ব্যক্তির এড্রেস রয়েছে। তাঁর এ উদ্যোগের সুবাদে আল্লাহ তা‘আলা অনেক মুসলিম ও অমুসলিমের হিদায়াত নসীব করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে উত্তম বিনিময় দান করুন। ওই ভাইয়ের এড্রেসটির নাম ‘ই-গ্রুপস কোম্পানি’। প্রকৃতই সেটি বর্তমানে এ অঙ্গনের শ্রেষ্ঠ কোম্পানি। নিচে তাঁর এড্রেস লিংক দেওয়া হলো। চাইলে আপনি এখানে ক্লিক করে দেখতে পারেন :
যঃঃঢ়://িি.িবমৎড়ঁঢ়ং.পড়স/মৎড়ঁঢ়/ফধষববষ। আমি নিজেও একটি তালিকা প্রণয়ন করেছি যেখানে কয়েক হাজার ব্যক্তির ই-মেইল এড্রেস সংগ্রহ করা হয়েছে।

ভবিষ্যতে ইসলামের ওপর ভ্রান্ত ফেরকাগুলোর সাইটের প্রভাব
এখনই সচেতন হোন!
বর্তমানে ইন্টারনেটে সবচে ভয়ঙ্কর বিপদ এবং বড় আশঙ্কাজনক দিক হলো অনেকগুলো ভ্রান্ত দলের আত্মপ্রকাশ, যারা ইসলামকে তুলে ধরার নামে দীন সম্পর্কে অজ্ঞ সাধারণ মুসলিম এবং সত্য ধর্ম সন্ধানী, ইসলামের সঠিক পরিচয় প্রত্যাশী ভাই-বোনদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। হায় অনুভূতি, সত্বরই এরা কী পড়বে আর অচিরেই এরা কী দেখবে?!
আল-সুন্নাহ সাইটের এক দা‘ইর ঘটনা। তিনি একদিন একটি চ্যাট রুমে বসা ছিলেন। তখন তাকে এক যুবক আহমদিয়া সম্প্রদায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। এটি এমন জামাত সারা বিশ্বের আলিমগণ যাদের কাফের ফতোয়া দিয়েছেন। ইন্টারনেটে এদের ব্যাপক প্রোপাগান্ডা রয়েছে। তিনি তার জবাবে ব্যাপক উদ্ধৃতি দিয়ে তাদের কাফের হবার বিষয়টি তুলে ধরলেন। যুবকটি তার সঙ্গে এ বিষয়টি নিয়ে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করে, যা তার অজ্ঞাত ছিল। কয়েকদিন ধারাবাহিক আলোচনার পর তিনি জানতে পারেন যুবকটি তুরস্কের একজন সুন্নী মুসলিম। ভ্রান্ত আমহদিয়া সম্প্রদায়ের একটি ওয়েবসাইট থেকে তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ, তার কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। তিনি এর ভয়াবহতা ও ঈমান বিধ্বংসী দিক বুঝতে সক্ষম হন। এজন্য তিনি আল্লাহর কাছে তাওবা করেন। যুবকটি আজও তাঁর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছে।
যুব সম্প্রদায়ের প্রতি বিনীত আবেদন
যুবক ভাইদের প্রতি অনুরোধ, আপনারা এই আধুনিক প্রচার মাধ্যমটিকে উত্তম কাজে লাগান। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে লগ্নি করুন। এবং আল্লাহর হারাম করা বিষয়গুলো থেকে সর্বাত্বকভাবে বিরত থাকুন। বিশেষত আজ যখন তা মানুষের জন্য বিপদের আকার ধারণ করেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে ইন্টারনেট একটি দোধারি অস্ত্র। আমাদের তাই মানুষকে ইসলামের দিকে ডাকা এবং নিজের আখলাক ও আচরণ দিয়ে ইসলামের সঠিক চিত্র তুলে ধরার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। এটি কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। ইসলামগ্রহণকারী অনেক ব্যক্তির খবর নিলে জানা যায়, তাদের অভিজ্ঞতার কথা শুনছে দেখা যায়, তাদের ইসলাম গ্রহণের কোনো মুসলিম যুবক বা যুবতীর অবদান রয়েছে যিনি তার সামনে ইসলামের আচার-শিষ্টাচার ও বিধান-সংবিধানের সঠিক চিত্র চিত্তাকর্ষক ভাষায় তুলে ধরেছেন। মনে রাখতে হবে মুখের ভাষায় দাওয়াতের চেয়ে কর্ম ও আচরণের মাধ্যমে দেওয়া দাওয়াতই বেশি কার্যকর হয়।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আপনারা কি ইন্টারনেটের মাধ্যমে দাওয়াতে দীনের যিম্মাদারী আদায় করতে চান? আপনার জন্য প্রতিদান ও অফুরন্ত নেকী হিসেবে সে ওয়াদাগুলোই যথেষ্ট যা মহা সত্যবাদী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ থেকে বের হয়েছে। আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনুহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى ، كَانَ لَهُ مِنَ الأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنِ اتَّبَعَهُ ، لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا ، وَمَنْ دَعَا إِلَى ضَلاَلَةٍ ، فَعَلَيْهِ مِنَ الإِثْمِ مِثْلُ آثَامِ مَنِ اتَّبَعَهُ ، لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ آثَامِهِمْ شَيْئًا.
‘যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের প্রতি (মানুষকে) আহ্বান জানাবে, যারা তার অনুসরণ করবে তাদের অনুরূপ নেকিই লেখা হবে ওই ব্যক্তির জন্য। অথচ এটি তাদের নেকির কোনো অংশ কমিয়ে দেবে না। আর যে কোনো ভ্রষ্টতার দিকে আহ্বান জানাবে, তাকে যারা অনুসরণ করবে তাদের সমান পাপই লেখা হবে তার জন্য। অথচ এটি তাদের পাপসমূহ থেকে এতটুকু কমাবে না। [ইবন মাজা : ২০৩; দারেমী : ৫৩০]
সাহল ইবন সা‘দ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
فَوَاللَّهِ لأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِكَ رَجُلاً وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْرُ النَّعَمِ.
‘আল্লাহর শপথ, ‘তোমার মাধ্যমে একজনকে আল্লাহর হেদায়েত দান করা তোমার জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম।’ [বুখারি : ৪২১০; মুসলিম : ৬৩৭৬]
আপনি কি চান না আল্লাহর রহমত আপনাকে বেষ্টন করে নিক? তবে আপনার জন্য দাওয়াতের পথ। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
﴿وَٱلۡمُؤۡمِنُونَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتُ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٖۚ يَأۡمُرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ وَيُؤۡتُونَ ٱلزَّكَوٰةَ وَيُطِيعُونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓۚ أُوْلَٰٓئِكَ سَيَرۡحَمُهُمُ ٱللَّهُۗ إِنَّ ٱللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيم﴾
‘আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, আর তারা সালাত কায়িম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এদেরকে আল্লাহ শীঘ্রই দয়া করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’
[সুরা আত-তাওবা, আয়াত : ৭১]
সর্বশেষ কথা, সাবধান! মনে রাখবেন, ইন্টারনেটে আপনি যত সময় দিচ্ছেন, কিয়ামতের দিন এ সময়গুলোর হিসাব দিতে হবে। কোথায় এগুলো কাটিয়েছেন? ভালো কাজে কাটালে ভালো অন্যথায় মন্দ কাজে কাটালে মন্দ বয়ে আনবে। আল্লাহ আমাদের সঠিক কাজ সঠিক ভাবে করার তাওফিক দান করুন (আমিন)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

slieder

Featured Posts
May 2018
M T W T F S S
    Jun »
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  
সর্বসত্ত্ব সত্বাধীকারী- শায়খ আফতাব উদ্দিন ফারুক Ⓒ