কিভাবে কাটবে আমাদের রমজান (৪য় কিস্তি)

রোযা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত,যার মাধ্যমে তাক্বওয়া অর্জিত হয়,আল্লাহর রহমত,মাগফিরাত ও নৈকট্য হাছিল হয়, জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ ও জান্নাত লাভ হয়। তাই সঠিকভাবে রোযা পালন করা জরুরি। রোযার অনেক আদব রয়েছে যার প্রতি লক্ষ্য রাখা প্রত্যেক রোযাদারের জন্য আবশ্যক। মূলতঃ প্রকৃত রোযাদার সেই,যার দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাপাচার থেকে;যবান মিথ্যা,নির্লজ্জ,কদর্যতাপূর্ণ ও অনর্থক কথা থেকে;উদর পানাহার থেকে বিরত থাকে। অর্থাৎ যদি সে কথা বলে তাহলে এমন কথা বলে না,যা তার ছিয়ামকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কোন কাজ করলে এমন কাজ করে না, যা তার ছিয়ামকে বিনষ্ট করে। তার মুখ থেকে উত্তম ও সুন্দর কথা বের হয়। কাজ করলে সৎ কাজ করে। তাই রোযাদার সকলের জন্য কল্যাণকারী হয়ে থাকে। এরূপ রোযা পালনকারীর জন্য পার্থিব জীবনে রয়েছে অশেষ কল্যাণ এবং পরকালে রয়েছে অফুরন্ত পুরস্কার।

রোযা রেখে কিছু কাজ একেবারেই বর্জনীয়। যা পরিত্যাগ না করলে আমাদের রোযা অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ রয়ে যাবে। এখানে আমরা পর্যায়ক্রমে সেগুলো উল্লেখ করবো ইনশাআল্লাহ

মিথ্যা কথা ও কাজ ত্যাগ করা :

মিথ্যার মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উপরে মিথ্যারোপ করা। অনুরূপভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি মিথ্যাকে সম্বন্ধিত করা। যেমন তাঁদের হালালকৃত জিনিসকে হারাম গণ্য করা এবং তাঁদের হারামকৃত জিনিসকে হালাল সাব্যস্ত করা। আল্লাহ বলেন,

وَلاَ تَقُوْلُوْا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلاَلٌ وَهَذَا حَرَامٌ لِتَفْتَرُوْا عَلَى اللهِ الْكَذِبَ إِنَّ الَّذِيْنَ يَفْتَرُوْنَ عَلَى اللهِ الْكَذِبَ لَا يُفْلِحُوْنَ، مَتَاعٌ قَلِيْلٌ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيْمٌ-

‘তোমাদের জিহবা মিথ্যা আরোপ করে বলে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করার জন্য তোমরা বলো না, এটা হালাল এবং ওটা হারাম। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করবে তারা সফলকাম হবে না। তাদের সুখ-সম্ভোগ সামান্যই এবং তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি’ (নাহল ১৬/১১৬-১৭)

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

مَنْ كَذَبَ عَلَىَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ

‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার উপরে মিথ্যারোপ করল, সে যেন জাহান্নামে নিজের স্থান নির্ধারণ করে নিল’।[বুখারী হা/১২৯১; মুসলিম হা/৪ ‘মিথ্যা হ’তে সতর্কতা’ অনুচ্ছেদ।] তিনি আরো বলেন,

إِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِىْ إِلَى الْفُجُوْرِ وَإِنَّ الْفُجُوْرَ يَهْدِىْ إِلَى النَّارِ وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَكْذِبُ وَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللهِ كَذَّابًا

‘তোমরা মিথ্যাচার পরিহার কর। কেননা মিথ্যাচার পাপের দিকে ধাবিত করে এবং পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। কোন লোক অনবরত মিথ্যা বলতে থাকে এবং মিথ্যাচারকে স্বভাবে পরিণত করে। অবশেষে আল্লাহর নিকটে তার নাম মিথ্যাবাদী হিসাবে লিখিত হয়’।[মুসলিম হা/২৬০৭ (১০৫); আবু দাউদ হা/৪৯৮৯; ছহীহ আত-তারগীব হা/১৭৯৩।]

গীবত পরিহার করা :

গীবত হচ্ছে কোন মুসলিম ভাইয়ের অগোচরে তার এমন কোন বিষয় উল্লেখ করা যা সে অপসন্দ করে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,

أَتَدْرُوْنَ مَا الْغِيْبَةُ، قَالُوْا اللهُ وَرَسُوْلُهُ أَعْلَمُ، قَالَ ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ، قِيْلَ أَفَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِىْ أَخِىْ مَا أَقُوْلُ، قَالَ إِنْ كَانَ فِيْهِ مَا تَقُوْلُ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيْهِ فَقَدْ بَهَتَّهُ-

‘তোমরা কি জান গীবত কি? ছাহাবায়ে কেরাম বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত। তিনি বললেন, তোমার কোন ভাইয়ের এমন কোন বিষয় উল্লেখ করা যা সে অপসন্দ করে। বলা হ’ল, (এ ব্যাপারে) আপনার অভিমত কি যে, আমি যা বলি তা যদি আমার ভাইয়ের মাঝে থাকে? তিনি বললেন, তুমি যা বল, তা যদি তোমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে, তাহ’লে তুমি তার গীবত করলে। আর যদি তার মধ্যে না থাকে তাহ’লে তুমি তার প্রতি অপবাদ দিলে’।[মুসলিম হা/৬৭৫৮, ‘গীবত হারাম’ অনুচ্ছেদ; মিশকাত হা/৪৮২৮।/] মহান আল্লাহ গীবত করতে নিষেধ করেছেন এবং একে মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণের সাথে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন,

وَلاَ يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيْهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوْهُ

‘তোমরা একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা (গীবত) করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পসন্দ করবে? বস্ত্তত তোমরা তো একে ঘৃণ্যই মনে কর’ (হুজুরাত ৪৯/১২)।

নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, মি‘রাজের রাতে আমি এমন এক সম্প্রদায়ের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম যাদের নখগুলো তামার তৈরী, যা দ্বারা তারা অনবরত তাদের মুখমন্ডল ও বক্ষদেশে অাঁচড় কাঁটছে। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

مَنْ هَؤُلاَءِ يَا جِبْرِيْلُ قَالَ هَؤُلاَءِ الَّذِيْنَ يَأْكُلُوْنَ لُحُوْمَ النَّاسِ وَيَقَعُوْنَ فِىْ أَعْرَاضِهِمْ

‘এরা কারা হে জিবরীল! তিনি বললেন, এরা ঐ সমস্ত লোক যারা মানুষের গোশত খেত (গীবত করতো) এবং তাদের মান-সম্মানে আঘাত আঘাত হানতো’।[আবু দাউদ হা/৪৮৭৮; মিশকাত হা/৫০৪৬]

চোগলখুরী ত্যাগ করা :

চোগলখুরী হচ্ছে বিবাদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একের কথা অপরকে বলা। এটা বড় পাপ। রাসূল (ছাঃ) বলেন,

لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ

‘চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না’।[মুসলিম, হা/৩০৩; তিরমিযী হা/৯৮১; মিশকাত হা/৪৮২৩।]

অপর একটি হাদীছে এসেছে,একদা রাসূল (ছাঃ) দু’টি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন,

إِنَّهُمَا لَيُعَذَّبَانِ وَمَا يُعَذَّبَانِ فِيْ كَبِيْرٍ، أَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ لاَ يَسْتَتِرُ مِنَ الْبَوْلِ وَأَمَّا الْآخَرُ فَكَانَ يَمْشِيْ بِالنَّمِيْمَةِ-

‘এ দু’ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। অথচ তাদেরকে বড় কোন পাপের কারণে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না। তাদের একজন পেশাব থেকে সতর্কতা অবলম্বন করত না। আর অপরজন চোগলখোরী করে বেড়াত’।[বুখারী হা/২১১; নাসাঈ হা/২০৪২; আবু দাউদ হা/১৯। /]

আল্লাহ বলেন,

وَلَا تُطِعْ كُلَّ حَلَّافٍ مَهِيْنٍ، هَمَّازٍ مَشَّاءٍ بِنَمِيْمٍ

‘আর অনুসরণ করো না তার যে কথায় কথায় শপথ করে, যে লাঞ্ছিত; পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অপরের নিকটে লাগিয়ে বেড়ায়’ (ক্বলাম ৬৮/১০-১১)

চোগলখোরী ব্যক্তি ও পরিবারের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করে এবং মুসলমানদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও শত্রুতা পয়দা করে। তাই এটা সর্বোতভাবে পরিত্যাজ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

slieder

Featured Posts
May 2018
M T W T F S S
    Jun »
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  
সর্বসত্ত্ব সত্বাধীকারী- শায়খ আফতাব উদ্দিন ফারুক Ⓒ