ইসলামে যাকাতের বিধান (পর্ব ১)

যাকাতের পরিচয়

যাকাত ইসলাম ধর্মের পঞ্চস্তম্ভের একটি।প্রত্যেক স্বাধীন, পূর্ণবয়স্ক মুসলমান নর-নারীকে প্রতি বছর স্বীয় আয় ও সম্পত্তির একটি নির্দিষ্ট অংশ, যদি তা ইসলামী শরিয়ত নির্ধারিত সীমা (নিসাব পরিমাণ) অতিক্রম করে তবে, তা কোরআন শরীফে নির্দিস্ট করে দেওয়া খাত সমূহতে বিতরণের নিয়মকে যাকাত বলা হয়।

যাকাত শব্দটি আরবী। অর্থ পবিত্রতা বা বৃদ্ধি।শরীয়তের পরিভাষায় যাকাত হলো আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শরীয়তের নির্দেশ মুতাবিক এক নির্দিষ্ট (নিসাব) পরিমাণ সম্পদ ছদকা গ্রহণের উপযোগী কোন মুসলমানের অধিকারে দিয়ে দেয়া। এ স্থলে দাতা গ্রহীতা থেকে বিনিময়স্বরূপ কোন ফায়দা হাছিল করতে পারবে না। কোন সুবিধা হাছিল করলে বা হাছিলের আশা রাখলে তার যাকাত আদায় হবেনা।

যাকাতের গুরুত্ব

অনেক ইবাদতই কুরআন কারীমে মাত্র ২/৪ বার উল্লেখিত হয়েছে, যেমন রোযা, হজ্জ ইত্যাদি। আবার কিছু ইবাদত অনেক বেশি বার উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনে একবার বললেই ফরয হয়ে যায়। বারবার বলার অর্থ গুরুত্ব বুঝানো। সালাতের পরে সবচেয়ে বেশি যাকাতের কথা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা সাধারণত দীনের সবচেয়ে বড় কাজ বুঝাতে বলি ‘নামায-রোযা’, কিন্তু কুরআনে কোথাও ‘নামায-রোযা’ বলা হয়নি, সব সময় বলা হয়েছে ‘নামায-যাকাত’। রোযা হলো যাকাতের পরে। যাকাত না দেওয়া কাফিরদের বৈশিষ্ট্য ও জাহান্নামের শাস্তির অন্যতম কারণ। আল্লাহ বলেন:

وَيْلٌ لِلْمُشْرِكِيْنَ الَّذِيْنَ لا يُؤْتُوْنَ الزَّكَاةَ وَهُمْ بِالآخِرَةِ هُمْ كَافِرُوْنَ

‘ধ্বংস মুশরিকদের জন্য, যারা যাকাত প্রদান করে না, আর যারা আখেরাতে অবিশ্বাস করে।’ [সূরা ফুসসিলাত: ৬-৭]
কুরআনে বলা হয়েছে, জাহান্নামীগণকে প্রশ্ন করা হবে: কিজন্য তোমরা জাহান্নামে শাস্তি ভোগ করছ? তারা তাদের কুফুরীর উল্লেখের সাথে সাথে নামায ও যাকাত ত্যাগের কথা বলবে। তারা বলবে:

لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّيْنَ وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ الْمِسْكِيْنَ

‘আমরা সালাত পালনকারীগণের মধ্যে ছিলাম না। আর আমরা দরিদ্রগণকে খাওয়াতাম না।’ [সূরা আল-মুদ্দাসসির: ৪২-৪৩]
আমরা মনে করি, বৈধ-অবৈধভাবে মাল বৃদ্ধি করলে এবং সঞ্চয় করলেই সম্পদশালী হলাম। কিন্তু আল্লাহ বলেন উল্টো কথা। ব্যয় করলেই আল্লাহ বৃদ্ধি করেন। আপনি দুয়ে দুয়ে চার গুণেছেন। কিন্তু কার জন্য গুণলেন? আপনার জন্য না সন্তানদের জন্য? আল্লাহ বরকত নষ্ট করে দিলে কিছুই থাকবে না। কিভাবে বরকত নষ্ট হবে তা আপনি বুঝতেও পারবেন না। আল্লাহ তাঁর ওয়াদা ভঙ্গ করেন না।

আল্লাহ বলেন:  يَمْحَقُ اللهُ الرِّبَا وَيُرْبِيْ الصَّدَقَات

‘আল্লাহ সুদের বৃদ্ধিকে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করেন আর ‘সাদাকাহ’ বা যাকাতকে বৃদ্ধি করেন।’ [সূরা বাকারা: ২৭৬]

وَمَا آتَيْتُمْ مِن رِّبًا لِيَرْبُوَ فِيْ أَمْوَالِ النَّاسِ فَلاَ يَرْبُوْ عِنْدَ اللهِ وَمَا آتَيْتُمْ مِنْ زَكَاةٍ تُرِيْدُنَ وَجْهَ اللهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُضْعِفُونَ

‘এবং তোমরা মানুষের সম্পদ বৃদ্ধির জন্য যে বৃদ্ধি (সুদ) প্রদান কর তা আল্লাহর নিকট বৃদ্ধি পায় না। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তোমরা যে যাকাত প্রদান কর সেই যাকাতই হল বহুগুণ বৃদ্ধিকারী।’ [সূরা রূম: ৩৯]
আরো কয়েকটি সহীহ হাদীস:

ثَلاثٌ مَنْ فَعَلَهُنَّ فَقَدْ طَعِمَ طَعْمَ الإِيمَانِ مَنْ عَبَدَ اللَّهَ وَحْدَهُ وَ(عَلِمَ) أَنَّهُ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَأَعْطَى زَكَاةَ مَالِهِ طَيِّبَةً بِهَا نَفْسُهُ

‘যে ব্যক্তি তিনটি কাজ করবে সে ঈমানের স্বাদ ও মজা লাভ করবে: যে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে, জানবে যে আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং আনন্দিত চিত্তে পবিত্র মনে তার সম্পদের যাকাত প্রদান করবে।’ [সুনানু আবু দাউদ: ২/১০৩; আলবানী, সহীহুত তারগীব: ১/১৮৩]

ثَلاثٌ أَحْلِفُ عَلَيْهِنَّ لا يَجْعَلُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ مَنْ لَهُ سَهْمٌ فِي الإِسْلامِ كَمَنْ لا سَهْمَ لَهُ فَأَسْهُمُ الإِسْلامِ ثَلاثَةٌ الصَّلاةُ وَالصَّوْمُ وَالزَّكَاة

‘তিনটি বিষয় আমি শপথ করে বলছি: যে ব্যক্তির ইসলামে অংশ আছে আর যার ইসলামে কোন অংশ নেই দুইজনকে আল্লাহ কখনোই সমান করবেন না। ইসলামের অংশ তিনটি: সালাত, সিয়াম ও যাকাত।’ [হাকিম, আল-মুসতাদরাক ১/৬৭; হায়সামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ১/৩৭; আলবানী সহীহুত তারগীব ১/৮৯, ১৮১। হাদীসটি সহীহ]

مَنْ أَدَّى زَكَاةً مَالِهِ فَقَدْ ذَهَبَ عَنْهُ شَرُّهُ

‘যে তার সম্পদের যাকাত প্রদান করে, তার সম্পদের অকল্যাণ ও অমঙ্গল দূর হয়ে যায়।’ [হায়সামী, সহীহুত তারগীব ১/১৮২। হাদীসটি হাসান]

প্রথম যে তিন ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে তাদের একজন হলো যাকাত প্রদান থেকে বিরত সম্পদশালী মুসলিম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

وَأَمّا أَوَّلُ ثَلاَثَةٍ يَدْخُلُوْنَ النَّارَ فَأَمِيْرٌ مُسَلِّطٌ وَذُوْ ثَرْوَةٍ مِنْ مَالٍ لاَ يُؤَدِّيْ حَقَّ اللهِ فِيْ مَالِهِ وَفَقِيْرٌ فَجُوْرٌ

‘প্রথম যে তিন ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে তারা হলো: সেচ্ছাচারী শাসক বা প্রশাসক, সম্পদশালী ব্যক্তি যে তার সম্পদে আল্লাহর যে অধিকার (যাকাত) তা প্রদান করে না এবং পাপাচারে লিপ্ত দরিদ্র ব্যক্তি।’ [ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ ১০/৫১৩; হাকিম, সহীহুত তারগীব ২/৬৬। হাদীসটি সহীহ]

যাকাত প্রদান থেকে যে মুসলিম বিরত থাকে বা যাকাত দিতে টালবাহনা ও দ্বিধা করে তাকে হাদীসে অভিশপ্ত বা মাল‘ঊন বলা হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রা.) বলেন:

آكِلُ الرِّبَا وَمُوكِلُهُ وَكَاتِبُهُ وَشَاهِدَاهُ إِذَا عَلِمُوا بِهِ وَالْوَاشِمَةُ وَالْمُسْتَوْشِمَةُ لِلْحُسْنِ وَلاوِي الصَّدَقَةِ وَالْمُرْتَدُّ أَعْرَابِيًّا بَعْدَ هِجْرَتِهِ مَلْعُونُونَ عَلَى لِسَانِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

“সুদ গ্রহণকারী, সুদ প্রদানকারী, সুদের লেখক, সুদের সাক্ষীদ্বয়— যদি তা জেনেশুনে করে, সৌন্দর্যের জন্য যে নারী নিজের দেহে উল্কিকাটে বা অন্যের দেহে উল্কি কেটে দেয়, যাকাত প্রদানে যে ব্যক্তি টালবাহনা করে বা বিরত থাকে এবং হিজরত করার পরে আবার যে ব্যক্তি বেদুঈন (যাযাবর) জীবনে ফিরে যায় তারা সকলেই কিয়ামতের দিন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর-এর জবানীতে অভিশপ্ত মাল‘ঊন।’ [আহমদ, আল-মুসনাদ ১/৪০৯, ৪৩০, ৪৬৪; হাকিম, আল-মুসতাদরাক ১/৫৪৫; আলবানী, সহীহুত তারগীব ১/১৮৫। হাদীসটি হাসান]
যারা যাকাত না দিয়ে সম্পদ জমা করে রাখে তাদের বিষয়ে আল্লাহ বলেন:

وَلاَ يَحْسَبَنَّ الذِّيْنَ يَبْخَلُوْنَ بِمَا آتَاهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْراً لَهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَهُمْ سَيُطَوَّقُوْنَ مَا بَخِلُوْا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

‘আল্লাহ অনুগ্রহ করে যে সম্পদ দান করেছেন সেই সম্পদ নিয়ে যারা কৃপণতা করে, তারা যেন কখনই মনে না করে যে, তাদের এই সম্পদ তাদের জন্য কল্যাণবহ বা উপকারী, বরং তা তাদের জন্য ক্ষতিকর। তাদের কৃপণতা করে সঞ্চিত সম্পদ কিয়ামতের দিন তাদের গলার বেড়ী হবে।’ [সূরা আলে ইমরান: ১৮০]

হাদীসের আলোকে জানা যায় যে, কিছু কঠিন পাপ আছে যেগুলির শাস্তি শুধু আখিরাতেই নয়, দুনিয়াতেও ভোগ করতে হয়। বিশেষত যে পাপগুলি মানুষের অধিকারের সাথে জাড়িত এবং যে পাপের ফলে অন্য মানুষ কষ্ট পায় বা সমাজের ক্ষতি হয়। এরূপ পাপ যদি সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে তবে আল্লাহ সে সমাজে গযব দেন এবং সমাজের সকলেই সে শাস্তি ভোগ করে। যাকাত প্রদানে টালবাহানা সেসকল পাপের অন্যতম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

لَمْ تَظْهَرِ الْفَاحِشَةُ فِي قَوْمٍ قَطُّ حَتَّى يُعْلِنُوا بِهَا إِلا فَشَا فِيهِمُ الطَّاعُونُ وَالأَوْجَاعُ الَّتِي لَمْ تَكُنْ مَضَتْ فِي أَسْلافِهِمِ الَّذِينَ مَضَوْا وَلَمْ يَنْقُصُوا الْمِكْيَالَ وَالْمِيزَانَ إِلا أُخِذُوا بِالسِّنِينَ وَشِدَّةِ الْمَئُونَةِ وَجَوْرِ السُّلْطَانِ عَلَيْهِمْ وَلَمْ يَمْنَعُوا زَكَاةَ أَمْوَالِهِمْ إِلا مُنِعُوا الْقَطْرَ مِنَ السَّمَاءِ وَلَوْلا الْبَهَائِمُ لَمْ يُمْطَرُوا وَلَمْ يَنْقُضُوا عَهْدَ اللَّهِ وَعَهْدَ رَسُولِهِ إِلا سَلَّطَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ عَدُوًّا مِنْ غَيْرِهِمْ فَأَخَذُوا بَعْضَ مَا فِي أَيْدِيهِمْ وَمَا لَمْ تَحْكُمْ أَئِمَّتُهُمْ بِكِتَابِ اللَّهِ وَيَتَخَيَّرُوا مِمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ إِلا جَعَلَ اللَّهُ بَأْسَهُمْ بَيْنَهُمْ.

‘(১) যখন কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে অশ্লীলতা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে তারা প্রকাশ্যে অশ্লীলতায় লিপ্ত হতে থাকে, তখন তাদের মধ্যে এমন সব রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে যা তাদের পুর্বপুরুষদের মধ্যে প্রসারিত ছিল না। (২) যখন কোন সম্প্রদায়ের মানুষেরা ওজনে কম বা ভেজাল দিতে থাকে, তখন তারা দুর্ভিক্ষ, জীবনযাত্রার কাঠিন্য ও প্রশাসনের বা ক্ষমতাশীলদের অত্যাচারের শিকার হয়। (৩) যদি কোন সম্প্রদায়ের মানুষেরা যাকাত প্রদান না করে, তাহলে তারা অনাবৃষ্টির শিকার হয়। যদি পশুপাখি না থাকতো তাহলে তারা বৃষ্টি থেকে একেবারেই বঞ্চিত হতো। (৪) যখন কোন সম্প্রদায়ের মানুষ আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের ওয়াদা বা আল্লাহর নামে প্রদত্ত ওয়াদা ভঙ্গ করে, তখন আল্লাহ তাদের কোন বিজাতীয় শত্রুকে তাদের উপর ক্ষমতাবান করে দেন, যারা তাদের কিছু সম্পদ নিয়ে যায়। (৫) আর যদি কোন সম্প্রদায়ের শাসকবর্গ ও নেতাগণ আল্লাহর কিতাব (পবিত্র কুরআন) অনুযায়ী বিচার শাসন না করেন এবং আল্লাহর বিধানের সঠিক ও ন্যায়ানুগ প্রয়োগের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা না করে, তখন আল্লাহ তাদের মধ্যে পরস্পর শত্রুতা ও মতবিরোধ সৃষ্টি করে দেন, তারা তাদের বীরত্ব একে অপরকে দেখাতে থাকে।’ [ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ২/১৩৩২; হায়সামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৫/৩১৮; আলবানী, সহীহুত তারগীব ১/১৮৭। হাদীসটি সহীহ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

slieder

Featured Posts
May 2018
M T W T F S S
    Jun »
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  
সর্বসত্ত্ব সত্বাধীকারী- শায়খ আফতাব উদ্দিন ফারুক Ⓒ