আশুরার করণীয় ও বর্জনীয় আমল

আশুরা অর্থ দশম। আরবি মহাররম মাসের দশম তারিখ ইতিহাসে আশুরা বলে খ্যাত। আল্লাহ তায়ালা এই দিবসে এমন অনেক ঘটনা ঘটিয়েছেন যা সত্যই আশ্চর্যপূর্ণ। একাধিক সূত্রে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তায়ালা এইদিনে পৃথিবীর সূচনা করেছেন। আবার এই দিনেই এই জগত ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। এই দিনে হযরত আদম আলাইহিস সালামের দোয়া কবুল হয়েছে। এই দিনে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম আগুন থেকে মুক্তি পেয়েছেন। হযরত মুসা আলাইহিস সালাম এই দিনে জালিম বাদশা ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। আরও অনেক ঘটনার সাক্ষি হয়ে আছে এই ঐতিহাসিক দিনটি। তাই ইসলামের আগে থেকেই অন্যান্য ধর্মীয় ইবাদতের মধ্যে আশুরা গুরুত্ব সহকারে আদায় করা হতো। একপর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের এই দিনে রোযা রাখার এবং এর আগে কিংবা পরে একদিন রোযা রাখার নির্দেশ প্রদান করেন। হাদিসের কিতাব থেকে সাব্যস্ত, ইসলামে প্রাথমিক ভাবে যতদিন পর্যন্ত রমজানের রোযা ফরয হয়নি ততদিন পর্যন্ত এই মহাররমের রোযাই ছিল আবশ্যক।
প্রিয় পাঠক আজ আমরা আপনাদের সম্মুখে আশুরার তাৎপর্য ও এদিনের করনীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে কুরআন ও হাদিস থেকে কিছু কথা তুলে ধরছি-
১নং হাদিস
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانُوا يَصُومُونَ عَاشُورَاءَ قَبْلَ أَنْ يُفْرَضَ رَمَضَانُ وَكَانَ يَوْمًا تُسْتَرُ فِيهِ الْكَعْبَةُ فَلَمَّا فَرَضَ اللهُ رَمَضَانَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ شَاءَ أَنْ يَصُومَهُ فَلْيَصُمْهُ وَمَنْ شَاءَ أَنْ يَتْرُكَهُ فَلْيَتْرُكْهُ
হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রমযানের রোযা ফরজ হওয়ার পূর্বে তারা আশুরার রোযা রাখতেন। আর সেদিন কাবা শরিফে গিলাফ পড়ানো হতো। অতঃপর যখন আল্লাহ রমযানের রোযা ফরজ করলেন, (তখন) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে আশুরার রোযা রাখতে চায়, সে রাখুক। আর যে আশুরার রোযা ছেড়ে দিতে চায়, সে ছেড়ে দিক। (বুখারি শরিফ, হাদিস নং ১৪৮৯)

২নং হাদিস
عَنْ اِبْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا قَدِمَ الْمَدِينَةَ وَجَدَهُمْ يَصُومُونَ يَوْمًا يَعْنِي عَاشُورَاءَ فَقَالُوا هَذَا يَوْمٌ عَظِيمٌ وَهُوَ يَوْمٌ نَجَّى اللهُ فِيهِ مُوسَى وَأَغْرَقَ آلَ فِرْعَوْنَ فَصَامَ مُوسَى شُكْرًا لِلَّهِ فَقَالَ أَنَا أَوْلَى بِمُوسَى مِنْهُمْ فَصَامَهُ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ
হযরত ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা থেকে বর্ণিত। যখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমন করলেন। (তখন) তিনি তাদেরকে (মদিনাবাসীকে) একদিন অর্থাৎ আশুরার দিন রোযা রাখতে দেখতে পেলেন। তখন তারা (মদিনাবাসী) বললো, এটি একটি মহান দিন। যেদিনে আল্লাহ মুসাকে (আলাইহিস-সালাম) নাজাত দিয়েছেন আর ফেরাউনের বাহিনীকে ডুবিয়ে মেরেছেন। তাই মুসা (আলাইহিস-সালাম) আল্লাহর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রোযা রেখেছিলেন। তখন তিনি (নবিজি) বললেন, মুসা (আলাইহিস-সালাম)-এর ব্যাপারে আমি তাদের চাইতে অধিক ঘনিষ্ঠ। তখন থেকে তিনি আশুরার রোযা রাখতেন এবং আশুরার দিনে রোযা রাখার নির্দেশ দিতেন। (বুখারি শরিফ, হাদিস নং ৩১৪৫)
৩নং হাদিস
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللهِ الْمُحَرَّمُ وَأَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِ
হযরত আবু হুরায়রাহ রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, রমযানের পরে সর্বোত্তম রোযা হলো আল্লাহর মাস মুহাররম মাসের রোযা। আর ফরয নামাযের পরে সর্বোত্তম নামায হলো রাতের নামায (অর্থাৎ তাহাজ্জুদের নামায)। (মুসলিম শরিফ, হাদিস নং ১৯৮২)
৪নং হাদিস
حَدَّثَنَا الْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ الْحُلْوَانِيُّ حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي مَرْيَمَ حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ أَيُّوبَ حَدَّثَنِي إِسْمَعِيلُ بْنُ أُمَيَّةَ أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا غَطَفَانَ بْنَ طَرِيفٍ الْمُرِّيَّ يَقُولُ سَمِعْتُ عَبْدَ اللهِ بْنَ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا يَقُولُ حِينَ صَامَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ إِنَّهُ يَوْمٌ تُعَظِّمُهُ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَإِذَا كَانَ الْعَامُ الْمُقْبِلُ إِنْ شَاءَ اللهُ صُمْنَا الْيَوْمَ التَّاسِعَ قَالَ فَلَمْ يَأْتِ الْعَامُ الْمُقْبِلُ حَتَّى تُوُفِّيَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
ইমাম মুসলিম বলেন, আমাদেরকে হাদিস শুনিয়েছেন আলহাসান বিন আলি আলহুলওয়ানি। তিনি বলেন, আমাদেরকে হাদিস শুনিয়েছেন ইবনে আবি মারইয়াম। তিনি বলেন, আমাদেরকে হাদিস শুনিয়েছেন ইয়াহইয়া ইবনে আইয়ুব। তিনি বলেন, আমাকে হাদিস শুনিয়েছেন ইসমাঈল ইবনে উমাইয়্যা। তিনি শুনেছেন আবু গাতাফান ইবনে তরিফ আলমুররি থেকে। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবেন আব্বাস রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা থেকে শুনেছি। তিনি (আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস) বলেন, যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশুরার দিনে রোযা রাখলেন এবং আশুরার রোযা রাখার নির্দেশ দিলেন, (তখন) সাহাবায়েকেরাম বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এই দিনকে ইয়াহুদি এবং নাসারা সম্মান প্রদর্শন করে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আগামি বছর ইনশা-আল্লাহ আমরা নবম তারিখেও রোযা রাখবো। বর্ণনাকারী (আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস) বলেন, আগামি বছর না আসতেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করলেন। (মুসলিম শরিফ, হাদিস নং ১৯১৬)

৫নং হাদিস
عَنْ عَلِيٍّ قَالَ سَأَلَهُ رَجُلٌ فَقَالَ أَيُّ شَهْرٍ تَأْمُرُنِي أَنْ أَصُومَ بَعْدَ شَهْرِ رَمَضَانَ قَالَ لَهُ مَا سَمِعْتُ أَحَدًا يَسْأَلُ عَنْ هَذَا إِلَّا رَجُلًا سَمِعْتُهُ يَسْأَلُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَا قَاعِدٌ عِنْدَهُ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ أَيُّ شَهْرٍ تَأْمُرُنِي أَنْ أَصُومَ بَعْدَ شَهْرِ رَمَضَانَ قَالَ إِنْ كُنْتَ صَائِمًا بَعْدَ شَهْرِ رَمَضَانَ فَصُمْ الْمُحَرَّمَ فَإِنَّهُ شَهْرُ اللهِ فِيهِ يَوْمٌ تَابَ فِيهِ عَلَى قَوْمٍ وَيَتُوبُ فِيهِ عَلَى قَوْمٍ آخَرِينَ
হযরত আলি (রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞাসা করলো, রমযানের পরে আপনি আমাকে কোন মাসে রোযা রাখতে নির্দেশ দেন। তিনি (হযরত আলি) তাকে বললেন, এক ব্যক্তি ছাড়া আর কাউকে আমি এমন প্রশ্ন করতে শুনিনি। আমি তার কাছ থেকে শুনেছি, সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে (এ-বিষয়ে) জিজ্ঞাসা করছিলো। আমি তখন সেখানে বসা ছিলাম। অতঃপর সে বললো, ইয়া রাসুলাল্লাহ! রমযানের পরে আপনি আমাকে কোন মাসে রোযা রাখতে নির্দেশ প্রদান করেন? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি তুমি রমযান মাসের পর রোযা রাখতে চাও, তাহলে মুহাররম মাসে রোযা রাখো। কেননা, মুহাররম মাস হলো আল্লাহর মাস। এই মাসে এমন একটি দিন আছে যে দিনে আল্লাহ এক সম্প্রদায়ের তওবা কবুল করেছেন। আর আরেক সম্প্রদায়ের তওবা তিনি কবুল করবেন। (তিরমিযি শরিফ, হাদিস নং ৬৭২)

৬নং হাদিস
عَنْ أَبِي قَتَادَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ صِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ إِنِّي أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ
হযরত আবু কাতাদাহ (রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) থেকে বর্ণিত। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আশুরার দিনের রোযা সম্পর্কে আমি আশা রাখি যে তা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দিবে। (তিরমিযি শরিফ, হাদিস নং ৬৮৩)

আশুরার দিন যে সকল কাজ বর্জনীয়
আশুরার দিন ঈদের মতো উদযাপন করার কোনো বিধান নেই বলে শাস্ত্রবিদরা মনে করেন। ঐ দিন রোযা পালন ব্যতীত ঈদের গোসল, চোখে সুরমা দেওয়া, আগুন স্ফুলিঙ্গ নিয়ে খেলা, তাজিয়া মিছিল বের করা ইত্যাদি সব অবাঞ্ছিত বিদআত এবং অনেকটা শিয়া প্রবণতার প্রতীক। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই দিনের সঠিক তত্ব বুঝে সেই অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। (আমিন)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

slieder

Featured Posts
September 2018
M T W T F S S
« Aug    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
সর্বসত্ত্ব সত্বাধীকারী- শায়খ আফতাব উদ্দিন ফারুক Ⓒ